খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫
বাংলা কাব্যসঙ্গীতের ইতিহাসে যে ক’জন শিল্পীর নাম চিরভাস্বর হয়ে আছে, তাঁদের অন্যতম জগন্ময় মিত্র। বাংলা আধুনিক, নজরুলগীতি, ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরি, টপ্পাসহ সঙ্গীতের প্রায় সব ধারাতেই ছিল তাঁর সমান স্বচ্ছন্দ পদচারণা।
অসংখ্য কালজয়ী গানের শিল্পী হলেও ১৯৪৮ সালে রেকর্ড করা ‘চিঠি— তুমি আজ কত দূরে’ গানটি তাঁকে এনে দেয় অমরত্ব। প্রেমের আবেগে আচ্ছন্ন শ্রোতারা যেন গানটিকে নিজের মনেরই নিবেদিত প্রেমপত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ফলত, গানটি আজও বাংলা কাব্যসঙ্গীতের ইতিহাসে সর্বাধিক জনপ্রিয় ও বিক্রীত একক সঙ্গীত হিসেবে গণ্য হয়। শুধু এইচ এম ভি’র হিসেবেই ৭৮ আরপিএম রেকর্ড থেকে ক্যাসেট যুগ পর্যন্ত গানটির বিক্রি পঁচিশ লক্ষ কপিরও বেশি।
জন্ম ১৯১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর, কলকাতার এক সঙ্গীতমনস্ক পরিবারে। কিন্তু জন্মের আগেই নেমে আসে শোকের ছায়া—তাঁর বাবা যতীন্দ্রনাথ মিত্র মাত্র ২৫ বছর বয়সে চলে যান না ফেরার দেশে। পিতৃহারা, একাকী শৈশবেই শুরু হয় জগন্ময়ের জীবনযাত্রা।
প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ১৯৩৪ সালে এন্ট্রান্স পাস করেন। তবে এর আগেই শুরু হয়ে যায় তাঁর সঙ্গীত সাধনা। পিতামহ বিধুভূষণ মিত্র ও কাকা পঞ্চানন মিত্রের সঙ্গীতচর্চা তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। ১০–১১ বছর বয়সে কেশব মুখোপাধ্যায়ের কাছে ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরি, টপ্পার তালিম নেন তিনি।
১৯৩৮ সালে বেঙ্গল মিউজিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিযোগিতায় ধ্রুপদ, টপ্পা, ঠুংরি, রাগপ্রধান বাউল ও কীর্তন—প্রতিটি বিভাগেই প্রথম স্থান অর্জন করেন। সেই বছরেই এইচএমভি থেকে গান রেকর্ডের সুযোগ পান। প্রণব রায়ের লেখা ও কমল দাসগুপ্তের সুরে ‘প্রিয় হতে প্রিয়তর’ এবং ‘তোমার মতন কত না নয়ন’ তাঁকে প্রথম আলোচনায় নিয়ে আসে।
তাঁর কণ্ঠে ‘যদি বাসনা মনে দিবে দহন জ্বালা’ শুনে কাজী নজরুল ইসলাম মুগ্ধ হয়ে অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছিলেন। সেখান থেকেই নজরুলের সাথে আজীবনের সখ্যতা গড়ে ওঠে। নজরুলগীতির পাশাপাশি রবীন্দ্রসঙ্গীতও গেয়েছেন তিনি।
১৯৪২ সালে রেকর্ড করেন দুটি কালজয়ী কাব্যগীতি—‘সাতটি বছর আগে’ ও ‘সাতটি বছর পরে’। পরবর্তীতে ‘চিঠি— তুমি আজ কত দূরে’-র সাথে এ গানগুলো এক অনন্য মরমী ট্রিলজি রচনা করে।
১৯৪০–৫০-এর দশক জুড়ে একের পর এক হৃদয়স্পর্শী গান উপহার দেন তিনি—
‘ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে’,
‘আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়’,
‘যাদের জীবন ভরা শুধু আঁখিজল’,
‘তুমি কি এখন দেখিছ স্বপন’,
‘ভুলি নাই ভুলি নাই’,
‘হৃদয় যেন কাহারে চেয়েছিল’,
‘শাওনও রাতে যদি’—
এমন অসংখ্য গান তাঁকে চিরদিনের জন্য শ্রোতাদের মনের মুকুরে আসীন করে রাখে।
৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৩ সালে স্তব্ধ হয়ে যায় জগন্ময় মিত্রের অমূল্য কণ্ঠ। কিন্তু রেখে যান গানের ভুবন জুড়ে এক চিরন্তন রোমান্টিক আবেশ—যেখানে চিরকালের প্রিয়তম তাঁর প্রিয়তমার আশায় আজও নিরবধি তপস্যা করে।
বাংলা কাব্যসঙ্গীতের আকাশে জগন্ময় মিত্র আজও এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার আলো ম্লান হবার নয়।
আজ এই সঙ্গীত নক্ষত্রে জন্মতীথিতে অতল ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার্ঘ্য।
খবরওয়ালা/শরিফ