খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
রাজশাহী মহানগরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে টিসিবি (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) কার্ড বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ধনী ও সচ্ছল ব্যক্তিরা নিজেদের ‘দিনমজুর’ পরিচয় দিয়ে এই কার্ড হাতিয়ে নিচ্ছেন, যার ফলে প্রকৃত দুস্থ ও গরিব মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। এ নিয়ে রাজশাহীর জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মী ফজলুর রহমান, যিনি একটি তিনতলা বাড়ির মালিক, নিজেকে দিনমজুর পরিচয় দিয়ে টিসিবি কার্ড পেয়েছেন। তিনি অভিজাত ব্যাংক কলোনির আমির হামজা রোডে বসবাস করেন। যোগাযোগ করা হলে তিনি কার্ডের জন্য আবেদন করার কথা স্বীকার করলেও, পেশা হিসেবে ‘দিনমজুর’ লেখার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
একইভাবে, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী তাজবুল হকও টিসিবি কার্ড পেয়েছেন। তার দাসপুকুর মোড়ে নিজস্ব বাড়ি রয়েছে এবং তিনি তার চার ছেলেকেই আলাদা বাড়ি করে দিয়েছেন। তার এক ছেলে বর্তমানে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে কর্মরত। তাকে ফোন করা হলেও তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
ওয়ার্ডের আরেক বাসিন্দা রবিউল ইসলামও কার্ড পেয়েছেন। তিনি নওদাপাড়া আমচত্বর এলাকায় একটি বড় হোটেলের মালিক। দাসপুকুর মহল্লায় তার একটি তিনতলা বাড়ি এবং একটি ব্যক্তিগত গাড়িও রয়েছে। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, রবিউল বিলাসী জীবনযাপন করেন এবং দুস্থদের বঞ্চিত করে তার কার্ড পাওয়াটা তাদের জন্য বিস্ময়ের কারণ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রবিউল বলেন, ‘আমার একতলা বাড়ি আছে, গাড়ি থাকার অভিযোগ ভিত্তিহীন। পরিচিতদের গাড়ি আমি মাঝে মাঝে ব্যবহার করি।’ তবে তিনি দিনমজুর পরিচয়ে কার্ড নেওয়ার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমির অফিস সহায়ক কাজী নাজমুল কবিরও টিসিবি কার্ড পেয়েছেন, যেখানে তার পেশা হিসেবে দিনমজুর লেখা হয়েছে। নাজমুল বলেন, “আমার জাতীয় পরিচয়পত্র মহল্লার লোকজন নিয়েছিল। তারাই পেশা হিসেবে কী লিখেছে তা আমি বলতে পারব না।”
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিটি করপোরেশন আগের কার্ড বাতিল করার পর দুটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে নতুন তালিকা তৈরির জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির করা তালিকায় সচ্ছলদের নাম উঠে এসেছে, কিন্তু প্রকৃত গরিব, দিনমজুর, বিধবা এবং প্রতিবন্ধীরা বাদ পড়েছেন।
মাসদার আলী (৫০), যিনি এক পায়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাজারে ঝাড়ু দেন এবং মাসে মাত্র সাড়ে ৪ হাজার টাকা আয় করেন, তাকেও কার্ড দেওয়া হয়নি। আগে তার একটি টিসিবি কার্ড ছিল, যা এবার বাতিল করা হয়েছে। একইভাবে, ৬০ বছর বয়সী রংমিস্ত্রি আজাদ আলীও এবার কার্ড পাননি। তিনি বলেন, ‘এই বয়সেও কাজ করি, কারণ সংসারে অসচ্ছলতা আছে। আমার কার্ডও বাতিল হয়েছে।’
এদিকে, কার্ডের তালিকা প্রণয়নে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং প্রকৃত দুস্থদের বাদ দেওয়ার অভিযোগে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি সালমগীর হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শামীম হোসেন স্বপন ২৫ জুন, ৮ আগস্ট এবং সর্বশেষ ৪ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক এবং সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তারা তালিকা বাতিল করে স্বচ্ছভাবে নতুন তালিকা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম এবং জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি।
সালমগীর হোসেন বলেন, ‘আমরা তিনবার আবেদন করেও তালিকা বাতিল করাতে পারিনি, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এর ফলে গরিব, অসহায় এবং প্রতিবন্ধী মানুষরা বঞ্চিত হচ্ছেন। তালিকা বাতিল করা না হলে এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হবে।’
খবরওয়ালা/টিএসএন