খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 28শে ভাদ্র ১৪৩২ | ১২ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
‘আমি ২০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে এসে দেখি, আমার ভোট আগেই অন্য কেউ দিয়ে গেছে। জীবনের প্রথম ভোট এভাবে নষ্ট হবে—আমি কোনোদিন ভাবিনি।’ বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) শহীদ রফিক-জব্বার হলের ভোটকেন্দ্রে এমন অভিযোগ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে আসা এক ভোটার। পরে সিসি ক্যামেরা ফুটেজ যাচাই করে তার অভিযোগের সত্যতাও মেলে।
এছাড়া ভোট অন্য কেউ দিয়ে দেওয়া, ব্যালট ছিঁড়ে ফেলা, কমিশনের পক্ষপাতিত্বের মতো নানা অভিযোগের মধ্য দিয়ে শেষ হয় জাকসু নির্বাচন। বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টায় ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সর্বশেষ কাজী নজরুল ইসলাম হল থেকে ব্যালট বাক্স নির্বাচন কমিশনের অফিস সিনেট হলে পৌঁছায় রাত ৮টায়। সেখানেই সব কেন্দ্রের ভোট গণনা হয়। তবে ভোট গণনা শেষ করতে ও ফল ঘোষণা হতে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে বলে নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব অধ্যাপক একেএম রাশিদুল আলম জানান। তার এ বক্তব্যের পর সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।
প্রার্থী ও প্যানেলের বর্জন
এর আগে দুপুরের পর ছাত্রদল সমর্থিত জিএস প্রার্থী তানজিলা হোসাইন বৈশাখী অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা জানতাম এ নির্বাচনটি হবে পাতানো। তাজউদ্দীন হলের ভোটার লিস্টে ছবি নেই। তাই দুই ঘণ্টা নির্বাচন বন্ধ ছিল। ২১ নম্বর হলে মব সৃষ্টি করা হয়েছিল। এর পেছনে ছিল ছাত্রশিবির। জাহানারা ইমাম হলে মব সৃষ্টি করা হয়েছে। কারচুপির কারণে নির্বাচন বন্ধ ছিল। মেয়েদের হলে আইডি কার্ড চেঞ্জ করে একই মেয়ে বারবার ভোট দেওয়ার পরও প্রশাসন কিছু বলেনি। ভোট কারচুপির অভিযোগে তাই আমরা নির্বাচন বর্জন করলাম।’
ছাত্রদলের পর একে একে বর্জনে যোগ দেন প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের চারটি প্যানেল—‘সম্প্রীতির ঐক্য’, ‘সংশপ্তক পর্ষদ’, ‘স্বতন্ত্র অঙ্গীকার পরিষদ’ ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আংশিক প্যানেল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরে সংবাদ সম্মেলন করে তারা বর্জনের ঘোষণা দেন। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেলের জিএস পদপ্রার্থী শরণ এহসান। এছাড়া কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
অভিযোগের পাহাড় ও প্রমাণের দাবি
‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ফারিয়া জামান নিকি বলেন, ‘নির্বাচনে কারচুপির সুস্পষ্ট প্রমাণ আমাদের হাতে আছে। এত অভিযোগ যে সংবাদ সম্মেলনেও ক্লিয়ার হতে পারেনি। কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট ঢুকতে না দেওয়া, একজনের ভোট আরেকজনের দেওয়া, বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোট বন্ধ রাখাসহ নানা অনিয়ম রয়েছে। অভিযোগ তো শুধু আমরা করিনি, এর আগের রাতেও শিবির নির্বাচন কমিশনের ওপর অনাস্থা জানিয়েছিল। বাগছাস সংবাদ সম্মেলন করে অনাস্থা জানিয়েছে। সব মিলিয়ে সবপক্ষই মনে করছে—এখানে নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতমূলক আচরণ তো করছেই, টাকা নেওয়ার নির্বাচন করছে।’
একই অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলনে শরণ এহসান বলেন, ‘ব্যালট বাক্স নিয়ে হট্টগোল থেকে শুরু করে বুধবার রাত ২টায় পোলিং এজেন্টের ঘোষণা দেওয়া, তার ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট ম্যানেজ করতে না পারা, পোলিং এজেন্টদের কাজ করতে না দেওয়া, নারী হলে পুরুষ প্রার্থীর প্রবেশ, ভোটার লিস্টে ছবি না থাকা, আঙুলে কালির দাগ না দেওয়া, ভোটার হওয়ার পরও তালিকায় নাম না থাকা ইত্যাদি অনেক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর গাফিলতির কারণে এই নির্বাচনকে ঘিরে অনেক সন্দেহ, আর প্রশ্ন ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই দায় কেবল এবং কেবলমাত্র এই ব্যর্থ, অথর্ব এবং পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশন আর প্রশাসনের।’
এছাড়া নির্বাচন বর্জন করেন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের তিন শিক্ষকও। নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক নাহরীন ইসলাম খান বলেন, ‘প্রশাসন শুরু থেকেই দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ করছে। নানা অনিয়ম, কারসাজি করছে। এরকম একটা নির্বাচনের দায়ভার আমাদের নেওয়া উচিত না। প্রতিবাদের জায়গা থেকে আমরা দায়িত্বশীল শিক্ষকরা এই নির্বাচনকে বর্জন করলাম।’
কমিশনের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক লুৎফর এলাহী বলেন, ‘আমি এখনও হলে অবস্থান করছি, কারা বর্জন করেছে এ বিষয়ে এখনও কিছু জানি না।’ তাকে বর্জনকারী প্যানেলের নাম জানালে তিনি বলেন, ‘এটা ওই প্যানেলগুলোর সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত। ভোট সুষ্ঠু হয়েছে, আমরা সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছি।’
ভোট ও প্রার্থী সংখ্যা
জাকসুতে এবার মোট ভোটার ১১ হাজার ৮৪৩ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৬ হাজার ১১৫ এবং ছাত্রী ৫ হাজার ৭২৮ জন। একজন ভোটার ৪০টি করে ভোট দেন—কেন্দ্রীয় সংসদে ২৫টি এবং হল সংসদে ১৫টি পদে।
এবার জাকসু ভোটে মোট প্রার্থী ১৭৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৩২ এবং নারী ৪৬ জন। প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য কেন্দ্রীয় সংসদে পদের সংখ্যা ২৫টি।
অন্যদিকে ২১টি হল সংসদে মোট পদের সংখ্যা ৩১৫টি। প্রতিটি হলে ১৫টি করে পদ। সব মিলিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৪৪৭ জন প্রার্থী। এর মধ্যে ১১ ছাত্র হলের প্রার্থী সংখ্যা ৩১৬ জন এবং ১০ ছাত্রী হলের প্রার্থী সংখ্যা ১৩১ জন।
খবরওয়ালা/শরিফ