নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রবিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের সমাজে ধর্ম একটি গভীর আবেগ ও বিশ্বাসের নাম। সেই বিশ্বাসের প্রতি মানুষের ভালোবাসা স্বাভাবিক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সেই বিশ্বাসকেই আজ এক শ্রেণির মানুষ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার বানিয়ে তুলেছে। এখন যেন এক নতুন ধারা তৈরি হয়েছে—‘ধর্ম বিক্রি।’ কেউ মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলছে তাদের নির্দেশনা মেনে চললেই জান্নাত নিশ্চিত, ইউটিউবের কিছু ভিত্তিহীন টাইটেলের মতোই ‘মাত্র এক ঘন্টায় জান্নাতের টিকেট’ বিক্রি করছে তারাও। এই প্রতারণার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ—কোমলমতি কিশোররা, শিক্ষাহীন গ্রামীণ জনতা কিংবা হতাশাগ্রস্ত শহুরে তরুণরা। কেউ আবার জেহাদের ভুয়া ফতোয়া দিয়ে ‘শহীদের মর্যাদা’ নামক বিভ্রান্তিকর স্বপ্নে কোমলমতি তরুণদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই ঘটনাগুলোকে আমরা শুধু বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে ভুল করব। এর পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত পরিকল্পনা, যেখানে ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে গড়ে তোলা হচ্ছে একটি উগ্র, সহিংস ও বিভক্ত সমাজ। ধর্মকে আড়াল বানিয়ে এই ব্যবসায়ীরা একদিকে অর্থ ও ক্ষমতা অর্জন করছে, অন্যদিকে রাষ্ট্র ও সমাজের স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—কেন মানুষ এদের কথায় প্রভাবিত হয়?
উত্তরটি সহজ। আমাদের সমাজে ধর্মীয় শিক্ষা ও জ্ঞান চর্চা যতটা হওয়ার কথা, ততটা হয়নি। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি আছে, কিন্তু সচেতনতা ও সঠিক বোঝাপড়া নেই। এই ফাঁকটিই ব্যবহার করছে কথিত ধর্মগুরু ও বক্তারা। তারা মানুষের অজ্ঞতা, হতাশা ও আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে।
ফলে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের বিপজ্জনক সংস্কৃতি, যেখানে ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা—সহনশীলতা, ন্যায়বিচার ও মানবতা—চলে যাচ্ছে পেছনে, আর সামনে আসছে ভয়, ঘৃণা ও বিভেদ। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বারবার নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, অথচ বিচার হয় না, দমন হয় না প্রতারণার উৎস। রাষ্ট্রের উদাসীনতা ও আইনের শিথিলতা এই প্রবণতাকে আরও বিস্তার দিচ্ছে। তরুণরা উগ্রবাদে জড়িয়ে জীবন বিসর্জন দিচ্ছে, অথচ এর সবকিছুই ঘটছে “ধর্মের নামে।”
আমাদের মনে রাখতে হবে, ধর্ম কখনো বিভেদ বা প্রতারণার হাতিয়ার নয়। ইসলাম এসেছে শান্তি, সহমর্মিতা ও মানবিক ন্যায়বিচারের বার্তা নিয়ে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন, “ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না।” মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেই বলেছেন—“ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না।” অথচ আমরা আজ সেই শিক্ষার বিপরীতে হাঁটছি।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যদি আলোকিত করতে হয়, তবে এই ধর্মব্যবসার প্রবণতাকে এখনই প্রতিরোধ করতে হবে। ধর্মের সঠিক শিক্ষা, সমালোচনামূলক চিন্তা, এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া এ সংকট থেকে বের হওয়ার পথ নেই।
জান্নাত কোনো মঞ্চের বক্তৃতায় এক ঘন্টায় নিশ্চিত হয় না। জান্নাতের পথ লুকিয়ে আছে সত্য, ন্যায়, মানবতা আর সৎ জীবনের ভেতরে। সেটিই আমাদের শিখতে হবে, সেটিই আমাদের ধারণ করতে হবে।
খবরওয়ালা/তানসিন