খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
চলতি বছরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঋণের বোঝা সামলাতে না পেরে মানুষ নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার ঘটনাগুলোতে আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি দেখা গেছে। শুধু আত্মহত্যাই নয়—কিছু ক্ষেত্রে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করে বসছেন। সামাজিক কটূক্তি, ধারদেনার চাপ এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতা এসব ঘটনায় প্রভাবিত মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
বৃহৎ জাতীয় জরিপভিত্তিক তথ্য থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রাদেশিক বাস্তবতা ঋণগ্রস্ততার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খাদ্য নিরাপত্তা পরিসংখ্যান-২০২৩ এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পরিবার মৌলিক চাহিদা মেটাতে (খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা) ঋণ নেয়। শহরের তুলনায় গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষ ঋণে অধিক নির্ভরশীল। দেশের ৭০ শতাংশ পরিবার গ্রামে বসবাস করে এবং তাদের মধ্যে বড় অংশই কোনো না কোনোভাবে ক্ষুদ্রঋণের সঙ্গে জড়িত।
ক্ষুদ্রঋণ—অনেকে জীবনযাত্রার আশ্রয় মনে করলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা গলার ফাঁস হয়ে ওঠে। চড়া সুদ, কিস্তির প্রতিদিনের চাপ ও এনজিওর চাপদানের ফলে বহু পরিবার সর্বস্বান্ত হচ্ছে। ঋণ শোধে ব্যর্থ হলে নিজের পৈতৃক সম্পদ বিক্রি থেকে শুরু করে সামাজিক হয়রানি—সবই কষ্টের সঙ্গে মিলেমিশে মানসিক অবসাদের জন্ম দেয়। পরিণামে কিছু মানুষ আত্মহত্যা পর্যন্ত ডেকে আনছেন, আবার অনেকে পরিবারের নাম পরিবর্তনহীন রেখে শেষ করেই দিচ্ছেন।
সাম্প্রতিক সময়ের কিছু হৃদয়বিদারক ঘটনার প্রেক্ষাপট এটিই বোঝায়—রাজশাহী পবা উপজেলার বামনশিকড় গ্রামের মিনারুল ইসলাম (৩৫) ১৫ আগস্ট নিজের বাড়ি থেকে তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করে আত্মহত্যা করেন; তিনি একটি চিরকুটে লিখেছিলেন, “আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে।” পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার নান্না ফরাজী (৫৫) নামের এক ব্যবসায়ী এনজিও ও স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছে নেয়া ঋণের বোঝা সহ্য করতে না পেয়ে ২৭ আগস্ট কীটনাশক পান করে আত্মহত্যা করেন। রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার আকবর হোসেন (৫০) ১৮ আগস্ট নিজের পানবাগানে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন; তিনি ১১টি এনজিও থেকে মিলিয়ে ছয়-সাত লাখ টাকা ঋণ নিয়ে কিস্তি দেয়া ঠেকিয়ে রাখতে পারেননি।
আত্মহত্যা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে একজন ব্যক্তি একাধিক সূত্র থেকে ঋণ নেয়—কোনোটা ছেলে-মেয়ের বিয়ে, কোনোটা পূর্বের ঋণ পরিশোধ কিংবা পুরনো জরুরি খরচ মেটাতেই। ফলে ঋণের বোঝা বেড়ে গেলে তিনি সামাজিক কটূক্তির শিকার হন, নতুন করে কেউ ঋণ দেয় না এবং আত্মসম্মানহানির ভয় তাকে মানসিক পতনের দিকে ঠেলে দেয়। এই মানসিক ও আর্থিক সংকটে পরিবারের সদস্যসহ আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্তও নেয়া হচ্ছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. অতনু রব্বানী বলেন, ’ঋণ দেয়ার আগে যথাযথ যাচাইবাছাই করা অত্যন্ত প্রয়োজন। ঋণগ্রস্ত কোনো ব্যক্তি যদি আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, তা অত্যন্ত দুঃখজনক—এ ধরনের ঘটনা রোধে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, এনজিও ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।’’
বিশ্লেষকরা বলছেন, সমস্যার গভীরে যেতে হলে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় আনতে হবে—(১) ক্ষুদ্রঋণের প্রকৃতি এবং সুদের হার ও কিস্তি শর্তসমূহের পুনর্বিবেচনা, (২) ঋণগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা জাল বৃদ্ধি এবং সংকটকালীন সহায়তা তৎপরতা, (৩) মানসিক স্বাস্থ্যের সহায়তা ও সচেতনতা প্রচার ও (৪) স্থানীয় পর্যায়ে সংকট নিরসনে দ্রুত হস্তক্ষেপ করার জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থার উন্নয়ন।
সরকারি-অর্থনৈতিক নীতির পাশাপাশি এনজিও ও মাইক্রো-ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দায়বদ্ধ হতে হবে—ঋণ প্রদানের সময় ঝুঁকি যাচাই, আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি ও মানবিক শর্তে সমাধান অনুসন্ধান করতে হবে। একই সাথে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে আত্মহত্যা প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে হবে।
অবশেষে, এই মানবিক বিপর্যয় রোধে জরুরি দরকার সমন্বিত এবং সহমর্মী পদক্ষেপ—অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, সামাজিক সুরক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্য সেবা মিলে না এলে ঋণের বোঝা বহনের চাপে আরও মানুষের জীবন অনুষ্ঠিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। সরকারি ও অ-সরকারী সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সংগঠনের দ্রুত এবং ফলপ্রসূ উদ্যোগ ছাড়া এসব ঘটনা থেমে যাবে না।
খবরওয়ালা/এমএজেড