খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
‘মাহবুব ক্রিয়েশন ফোর’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে প্রথম ছিন্নমূল মানুষদের চুল ও জটা কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পথে পথে ছিন্নমূল মানুষদের পরিষ্কার করার নামে তাদের চুল কেটে দেওয়া হতো। শুধু ছিন্নমূল নয়, ফকির–সন্ন্যাসী কেউই এর বাইরে থাকতেন না। পুরো দৃশ্য ভিডিও করে ফেসবুকে প্রকাশ করা হতো।
উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—ফেসবুক থেকে রাজস্ব আয়ের জন্য এসব ভিডিও বানানো। পাশাপাশি প্রবাসীদের কাছ থেকেও অনুদান নেওয়া হতো।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, একজন মানুষকে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন করার নামে যে ব্যয় হয়, ভিডিও থেকে তার বহুগুণ আয় করা সম্ভব হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় দেশি ও প্রবাসীদের অনুদান।
চুল ও জটা কেটে দেওয়ার আড়ালে গড়ে ওঠে বড় এক বাণিজ্য। অথচ যারা অর্থ সহায়তা দেন, তারা এই নেপথ্যের হিসাব জানেন না।
মাহবুব ক্রিয়েশন ফোরের এসব কাজ মাঝেমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হতো। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে একটি ভিডিও—যেখানে এক ব্যক্তির জোর করে জটা কেটে দেওয়া হয় এবং তাঁর হাতের বালা খুলে নেওয়া হয়।
কারণ, ওই ঘটনায় ধস্তাধস্তি ও মারামারিও হয়। জানা যায়, ওই ব্যক্তির নাম লিটন সাধু। তিনি রাজধানীর পোস্তগোলা মহাশ্মশানে লাশ সৎকারের কাজ করেন এবং পাশাপাশি সদরঘাট এলাকায় ফল বিক্রি করেন। আধ্যাত্মিক ভাবনা থেকে তিনি দীর্ঘদিন চুল–দাড়ি লম্বা রেখেছিলেন। দুই হাতে ছিল ধাতব বালা।
মাহবুব ক্রিয়েশন ফোরের উদ্যোক্তা মাহবুবুর রহমান ও তার দল লিটন সাধুর জটা ও চুল–দাড়ি জোরপূর্বক কেটে দেন। এসময় লিটন সাধু প্রাণপণ চেষ্টা করেও নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। তিনি লাথিও মেরেছিলেন, কিন্তু সব ব্যর্থ হয়। চুল কেটে দেওয়ার পর তাঁর হাতের প্রায় ৫০ ভরি রুপার বালা লুটে নেওয়া হয়, যার মূল্য আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা।
লিটন সাধুকে যেভাবে ধরে চুল ও জটা কেটে দেওয়া হয়েছে, একইভাবে আরও অনেককেই পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন করার নামে এভাবে চুল ও জটা কেটে দেওয়া হয়েছে। মাহবুবের এমন কর্মকাণ্ডের খবর প্রথম প্রকাশিত হয় গত ১৪ আগস্ট কালের কণ্ঠ অনলাইন সংস্করণে। এরপর দেশের অন্যান্য গণমাধ্যমও বিষয়টি প্রকাশ করে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। মাহবুবই দেশে এ ধরনের চুল ও জটা কাটার প্রবণতা প্রথম শুরু করেন, সম্প্রতি তাঁর ফেসবুক লাইভের বক্তব্য থেকেও সেটি স্পষ্ট হয়।
কে এই মাহবুব?
মাহবুবুর রহমান নিজের নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেছেন, যেখানে তিনি ‘জীবনবৃত্তান্ত’ আকারে নিজের পরিচয় তুলে ধরেছেন। সেখানে তিনি দাবি করেছেন, তিনি একজন সফল কনটেন্ট ক্রিয়েটর। নিজের নাম উল্লেখ করেছেন মাহবুবুর রহমান, ডাক নাম মাহবুব সরকার। বাবার নাম সামছুল আলম। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার বাইশগাঁও গ্রামে।
স্থানীয় পঞ্চগ্রাম স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক পাস করে ২০২০ সালে উচ্চমাধ্যমিক পড়ার জন্য ভর্তি হন ঢাকা উদ্যান সরকারি কলেজে।
ওয়েবসাইটে মাহবুব লিখেছেন—’ঢাকায় আসার পর থেকে রাস্তায় থাকা অসহায় মানুষগুলোকে দেখে আমার ভেতরে এক ধরনের মায়া কাজ করত। তাদের কাছে যেতাম, কথা বলার চেষ্টা করতাম। ২০২১ সাল থেকে তাদের জন্য কিছু করার ভাবনা শুরু হয়।” তিনি জানান, তার দলের সদস্য ছিলেন মাহফুজ, সৌরভ দাশ ও প্রিতম শর্মা।
সম্প্রতি এক ফেসবুক লাইভে মাহবুব বলেন, “আমাদের কাজগুলো নিয়ে অনেকেই সমালোচনা করছেন, ট্রল করছেন। আমরা কষ্টের সঙ্গে জানাচ্ছি, হয়তো এই কাজটা আর বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারব না। সমালোচনা আর নেতিবাচক উপস্থাপনায় আমরা হতাশ হয়ে যাচ্ছি।’
অল্প সময়ের মধ্যেই তার কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই তাকে অনুসরণ করতে শুরু করেন। কারণ এই কাজে খরচ কম হলেও ফেসবুক–ইউটিউবের ভিউ, বিজ্ঞাপন রাজস্ব এবং অনুদান থেকে আয় সম্ভব ছিল। তবে মাহবুবের কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়, কারণ তিনি অনেক সময় মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের চুল জোরপূর্বক কেটে দিতেন এবং সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করতেন।
নিজের কাজের শুরুর গল্প বলতে গিয়ে তিনি জানান—’২০২০ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় আসার পর এই মানুষগুলোর অবস্থা দেখে খুব খারাপ লাগত। তখন থেকেই কিছু করা শুরু করি। তবে খাওয়ানো, পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন করার কাজ শুরু করি দুই বছর আগে। এ সময় পর্যন্ত কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হইনি।”
তার দাবি, তার একটাই টিম আছে, অন্য কোনো জেলায় টিম নেই। কাজ করার সময় তারা নরম ব্যবহার ও ভালোবাসা দেখিয়ে এগিয়ে যান। কিন্তু ইদানীং অনেকেই নিজেদের তার টিম দাবি করে একই ধরনের কাজ করছে, যার কারণে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন।
কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘদিন ধরে মাহবুব এমন কাজ করেছেন যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “চুল কেটে দেওয়ার এখতিয়ার কারও নেই। এটা ব্যক্তিগত অধিকার। রাষ্ট্রও এতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এমন কাজ স্পষ্টতই বেআইনি এবং অপরাধ।’
সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী শাহদীন মালিক মন্তব্য করেন, “আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যদি আমার হাত ভেঙে দেওয়া হয়, সেটা যেমন অপরাধ, তেমনি আমার চুলও শরীরের অংশ। জোর করে কেটে দিলে ফৌজদারি অপরাধ হবে।”
শেষ পর্যন্ত মাহবুব বিষয়টি উপলব্ধি করেছেন। যে ফেসবুক পেইজ থেকে তিনি ভিডিও প্রকাশ করতেন, সেখানেই ঘোষণা দেন—“মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষদের নিয়ে আমাদের কার্যক্রম আজ থেকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ। আমাদের চোখে কাজটা ভালো মনে হলেও আইন অনুযায়ী এটা বেআইনি। তাই দেশের আইনের প্রতি সম্মান জানিয়ে আমরা কাজ ছেড়ে দিচ্ছি।”
আরেক পোস্টে তিনি লেখেন—“যদি আমাদের কাজ অপরাধ হয়ে থাকে তবে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আমার চোখে যা ভালো, আপনাদের চোখে হয়তো তা খারাপ লেগেছে। ছোট মানুষ হিসেবে আমাকে ক্ষমা করবেন। আজ থেকে আমাদের সব কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।”
আরেক পোস্টে তিনি আরও যোগ করেন—’আমাদের কোনো কাজের মাধ্যমে যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন, ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।’
খবরওয়ালা/এমএজেড