আফতাব তাজ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
গত ২৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে আয়োজিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ঘোষণা দেন—’যদি ভারত ঢুকে পড়ে, আমাদের ৫০ লাখ যুবক ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।’ একই সঙ্গে তিনি আরও দাবি করেন, এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জামায়াতের ওপর চাপানো বদনামও মুছে যাবে। নিউইয়র্কের বাংলাদেশ আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন (কোবা) আয়োজিত সেই গণসংবর্ধনায় তাহেরের এ বক্তব্য দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
এই মন্তব্য নিছক বক্তৃতার উন্মাদনা নয়; বরং এটি রাজনৈতিক ইন্ধন, ইতিহাসের সংবেদনশীল স্মৃতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা-চাপের এক বাস্তব সংকেত। এ বিশ্লেষণ বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে।
উস্কানিমূলক ভাষার প্রভাব
রাজনীতির মঞ্চে এমন সংখ্যাগত দাবি—’৫০ লাখ যুবক যুদ্ধ করবে’—বাস্তবতার সঙ্গে কোনোভাবেই খাপ খায় না। এটি নিছক সংখ্যার খেলা, যা দলীয় সমর্থকদের মধ্যে কৃত্রিম গৌরববোধ জাগাতে ব্যবহৃত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশের কাছে এটি সরাসরি নিরাপত্তাহানির বার্তা। রাজনৈতিক কৌশলে এ ধরনের উত্তেজক রেটরিক গ্রহণ করলে কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর আঘাত হানা অবশ্যম্ভাবী হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর প্রতিক্রিয়াও তীব্র হতে পারে।
১৯৭১-এর ইতিহাসের অপব্যবহার
তার বক্তব্যে তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জামায়াতের ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে নতুন যুদ্ধে নামলে তাদের ওপর চাপানো ‘বদনাম’ মুছে যাবে। ইতিহাসকে এমনভাবে ব্যবহার করা বিপজ্জনক। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি, যা বিচার ও গবেষণার মাধ্যমে মূল্যায়িত হবে। কোনো সামরিক সংঘাতকে অপরাধমোচনের উপায় হিসেবে দাঁড় করানো মানবিকতা ও ন্যায়নীতির পরিপন্থী। এতে সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি হয় এবং সমাজে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত রেখে যায়।
তৃতীয়ত: ধর্মীয় ভাষার অপপ্রয়োগ
নায়েবে আমির তাঁর বক্তৃতায় হাদিস ও ‘গাজওয়া’র প্রসঙ্গ টেনে যুদ্ধকে ধর্মীয় পবিত্রতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। এটি রাজনৈতিক ইসলামীকরণের সুস্পষ্ট কৌশল। ধর্মীয় আবেগকে যুদ্ধ ও সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করলে সাধারণ জনগণের মনে আবেগীয় উত্তেজনা তৈরি হয়, কিন্তু রাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডে তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। প্রতিবেশী রাজনীতিতে এমন মন্তব্য নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে, যা সীমান্তে অস্থিরতা, অর্থনৈতিক শাস্তি বা কূটনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অভিঘাত
আবদুল্লাহ তাহেরের বক্তব্যে আওয়ামী লীগসহ বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে অভিযুক্ত করা হয়েছে—তাদের নাকি ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ইচ্ছা নেই। এর ফলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ‘কে বেশি দেশপ্রেমিক’ এ ধরনের সামরিকতান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় রূপ নেবে। এই ধরনের উত্তেজনা গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে দুর্বল করে; নাগরিক সমাজকে অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দেয়। এমনকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান বা রাজনৈতিক সহিংসতার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে। ফলে এ ধরনের মন্তব্যের বিরুদ্ধে আইনি ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া অপরিহার্য।
আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ক্ষতি
বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুলাংশে বিদেশি বিনিয়োগ, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের যুদ্ধবাজি মন্তব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনাস্থা তৈরি করে। প্রবাসী ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ ছড়ায় এবং কূটনৈতিক সম্পর্কও চাপে পড়ে। ইতোমধ্যে কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তাহেরের বক্তব্য শিরোনামে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের কূটনৈতিক সতর্কতা জরুরি হয়ে পড়ে।
দায়িত্বের প্রশ্ন
জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক নেতাদের কথার ভার বহন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিশেষত যখন সেই কথাগুলো সহিংসতা বা সামরিক উস্কানি জাগায়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। নাগরিক সমাজ, সংবাদমাধ্যম এবং আইনপ্রণেতাদের উচিত হবে এই বক্তব্যের সমালোচনা করা, রাজনৈতিক জবাবদিহি দাবি করা এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
তাহেরের “৫০ লাখ যুবক যুদ্ধ করবে” মন্তব্য নিছক আবেগপ্রবণতা নয়; এটি ইতিহাস, কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করে। এতে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় আবেগের সমন্বয়ে একটি বিপজ্জনক বার্তা দেওয়া হয়েছে। ইতিহাস, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রনীতির আলোকে এ ধরনের বক্তব্যের বিরুদ্ধে সমাজের সর্বস্তরে প্রতিবাদ জাগ্রত হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে উগ্রবাদী কণ্ঠস্বরই প্রবল হয়ে উঠবে—যা দেশের গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মর্যাদার জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হবে।
খবরওয়ালা/এমএজেড