খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশ: সোমবার, ৬ অক্টোবর ২০২৫
দেশের আইন-শৃঙ্খলার অবনতির ফলে খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ ক্রমেই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। তথ্য-উপাত্ত বলছে, শহর-নগর, বন্দর-গ্রাম সর্বত্র হত্যা, চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ ইত্যাদি অপরাধ বেড়েছে। এর সঙ্গে থেমে নেই চাঁদাবাজিও।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান মতে, চলতি বছরে (জানুয়ারি-আগস্ট) এই আট মাসের হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে ৫৪০টি মামলা হয়েছে। এর আগের বছর প্রতি মাসে গড়ে মামলা হয়েছিল ৪৪৫টি। আগের বছরের চেয়ে চলতি বছর প্রতি মাসে গড়ে হত্যা, ডাকাতি, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণের জেরে ৯৫টি মামলা বেশি হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। এ ছাড়া বর্তমানে দেশের অস্থিতিশীল রাজনীতিও এসব অপরাধে কোনো না কোনোভাবে প্রভাব ফেলছে। এসব সমস্যার সমাধান না হলে শুধু পুলিশি পদক্ষেপে অপরাধ কমানো সম্ভব হবে না।
অপরাধ-চাঁদাবাজি চরমেঅপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অপরাধ যেভাবে বাড়ছে তা নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে স্বস্তি দেওয়া জরুরি। মানুষ ভালো নেই। তবে শুধু পুলিশি অভিযান নয়, সামাজিক সচেতনতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে অপরাধের হার কমানো সম্ভব।’
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানও অপরাধ বাড়ার সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংস্থার তথ্য মতে, চলতি বছর (জানুয়ারি-আগস্ট) এই আট মাসে সারাদেশে সবচেয়ে বেশি হত্যা, দস্যুতার ঘটনায় চার হাজার ৩১৬টি মামলা হয়েছে। সে হিসাবে গড়ে প্রতি মাসে ৫৪০টি মামলা হয়েছে। মোট মামলার মধ্যে ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা এক হাজার ৭০২টি এবং দুই হাজার ৬১৪টি খুনের মামলা। এর আগের বছর ২০২৪ সালে ১২ মাসে ডাকাতি-দস্যুতা ও হত্যার ঘটনায় মোট পাঁচ হাজার ৩৩৪টি মামলা হয়েছে। সে বছর প্রতি মাসে গড়ে মামলা হয়েছে ৪৪৫টি। এর মধ্যে ডাকাতি-দস্যুতায় এক হাজার ৯০২টি ও খুনের মামলা তিন হাজার ৪৩২টি। এই তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর প্রতি মাসে গড়ে ডাকাতি-দস্যুতা ও খুনের ঘটনায় ৯৫টি বেশি মামলা হয়েছে। এর আগের বছর ২০২৩ সালের সঙ্গে তুলনা করলে চলতি বছরের প্রতি মাসে গড়ে ১৬০টি মামলা বেড়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন পুলিশ পরিসংখ্যানে কখনো এসব ঘটনার প্রকৃত তথ্য উঠে আসে না, বাস্তবে এসব অপরাধ আরো বেশি ঘটছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
এর আগের বছরে (২০২৩ সালের আগস্ট থেকে গত বছরের জুলাই পর্যন্ত) সারাদেশে ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা হয়েছে এক হাজার ৬১৯টি। এই সময় মাসে গড়ে মামলা হয়েছে ১৩৫টি।
পুলিশ সদর দপ্তরের এই হিসাবে আগের বছরের চেয়ে পরের বছরে ৮৩৮টি মামলা বেশি হয়েছে। এ সময় মাসে ৭০টি মামলা বেশি হয়েছে।
আবার পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধবিষয়ক মাসিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ১৩ মাসে সারা দেশে সাত ধরনের অপরাধমূলক ঘটনায় ৩৯ হাজার ৯৩৬টি মামলা হয়েছে। এই হিসাবে প্রতি মাসে মামলা তিন হাজার ৭২টি। প্রতিদিন মামলা ১০২টি।
বেপরোয়া চাঁদাবাজি: চাঁদাবাজদের হামলায় আহত নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হামলাকারীরা লাঠি ও রড দিয়ে তাঁকেসহ পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। জেলার পুলিশ সুপার মিনহাজুল আলম বলেন, ‘পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত সাতজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। অন্যদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান চলছে।’
শুধু পুলিশের ওপর হামলাই নয়, ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজধানীসহ দেশের ৬৪ জেলায় নীরবে ও প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি চলছে। এমনকি দেশে পণ্য পরিবহনেও চাঁদাবাজি চলছে।
‘সমন্বয়ক’ পরিচয় দিয়ে মব সৃষ্টি করেও চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। গত ২৭ জুলাই রাতে রাজধানীর গুলশানে সমন্বয়ক পরিচয়ে চাঁদার বাকি অংশ নিতে আসা তরুণরা পুলিশি ফাঁদে ধরা পড়েন। সমন্বয়ক পরিচয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ছাত্র সমন্বয়ক মো. আসাদুর রহমান আকাশ তাঁর দুই সহযোগী ফরিদ উদ্দিন ও রবিনকে রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে যৌথ বাহিনী।
যৌথ বাহিনী সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারকৃত সন্ত্রাসীচক্রের প্রধান আসাদুর রহমান আকাশসহ তাঁর সহযোগীরা জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন বেআইনি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। সম্প্রতি তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় মব সৃষ্টি এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া তাঁরা বিভিন্ন মিথ্যা এবং হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে বিপুল পরিমাণ চাঁদা আদায় ও মামলা বাণিজ্য করে আসছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে মব ভায়োলেন্স সৃষ্টির মাধ্যমে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
৫ আগস্টের পর দেশে চাঁদাবাজি বেড়েছে: মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, গত বছরের ৫ আগস্টের পর দেশে চাঁদাবাজি বেড়েছে। ‘অন্তর্বর্তী সরকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি এবং রাজনৈতিক কমিটমেন্ট ছাড়া, রাজনৈতিক সরকার ছাড়া চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।’
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘আগে যেখানে এক টাকা চাঁদা নেওয়া হতো, এখন দেড় টাকা, দুই টাকা নেওয়া হচ্ছে। ৫ আগস্টের পর নানা পক্ষ চাঁদাবাজিতে জড়িয়েছে এবং আগে যারা ছিল, তারাও চাঁদাবাজির পেছনে আছে। যারা চাঁদাবাজি করে তারাই আবার ব্যবসায়ী সংগঠনের সদস্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘চাঁদাবাজির কারণে পণ্যমূল্য বাড়ছে। কিন্তু এটা থামানো আমার মন্ত্রণালয়ের কাজ না।
থামছে না মব সন্ত্রাস: সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) গত সেপ্টেম্বর মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছুতেই দেশে থামছে না মব সন্ত্রাস। গত মাসে দেশে গণপিটুনিতে আরো ২৪ জন প্রাণ হারিয়েছে। সেই সঙ্গে কমছে না খুন, ধর্ষণ। আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে এসে দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন বেড়েছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, সামাজিক অস্থিরতা, অসিহিষ্ণুতা, নৈতিক স্খলন প্রভৃতি কারণে সমাজে অপরাধ প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভাশেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলের অপরাধে এ বছরের ১৫ জুলাই থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ৬৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া প্রায় ৬০ শতাংশই নতুন মুখ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তার ঢাকা মহানগরী ও ঢাকা বিভাগে ৩২৩ জন। এদের মধ্যে ২২৩ জনই নতুন মুখ। এক মাসে গ্রেপ্তার হওয়া ৬৫০ জনের মধ্যে অর্ধেকের বেশি রাজনৈতিক কর্মী।
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন. চাঁদাবাজি একটি সামাজিক সমস্যা। চাঁদাবাজির জন্য নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান।
খবরওয়ালা/এমইউ