খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৬ অক্টোবর ২০২৫
স্বাধীনতার জন্য কতজন মানুষ যে জীবন উৎসর্গ করেছেন, কত পরিবার যে ত্যাগের অনল স্পর্শ করেছে— তার কতটুকুই বা আমরা জানি? ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়নি এমন অসংখ্য বীরনারীর রক্তগাথা। তেমনই এক অনন্য নাম — মাগুরার বীরকন্যা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা লুৎফুন নাহার হেলেনা।
১৯৭১ সালের পবিত্র শবে বরাতের রাতে পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়ে শহীদ হন এই সংগ্রামী নারী। ৫ অক্টোবর রাজাকাররা তাঁকে তাঁর শিশুপুত্রসহ মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার এক গ্রাম থেকে আটক করে। পরে তাঁকে মাগুরা শহরে নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে সোপর্দ করা হয়।
পাক সেনারা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এরপর তাঁর মৃতদেহ জিপের পেছনে বেঁধে টেনে নিয়ে যায় শহরের অদূরে নবগঙ্গা নদীর ডাইভারশন ক্যানেলে এবং সেখানে ফেলে দেয় তাঁর ক্ষতবিক্ষত দেহ।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় তাঁর স্বামী, মুক্তিযোদ্ধা আলী কদর-এর স্মৃতিচারণে। তিনি লিখেছেন— “হেলেনার মৃত্যুঘটনা ছিল করুণ ও মর্মান্তিক। রাজাকারদের বিশ্বাসঘাতকতায় হেলেনা তাঁর দেড় বছরের শিশুপুত্রসহ পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। তাঁর মুক্তির জন্য বৃদ্ধ পিতা ও আত্মীয়স্বজন অনুরোধ জানিয়েছিলেন, কিন্তু ঘাতক জামাতপন্থী দালালরা বাধা দেয়। তারা পাক কর্মকর্তাদের জানায়— হেলেনা বামপন্থি নেতা নিরোর বোন এবং মুক্তিযোদ্ধা আলী কদরের স্ত্রী। তাই তাঁর মুক্তির প্রশ্নই ওঠে না।”
‘হেলেন’ নামেও পরিচিত ছিলেন লুৎফুন নাহার হেলেনা। তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের মাগুরা আঞ্চলিক নেত্রী এবং মাগুরা কলেজ ছাত্র সংসদের মহিলা কমনরুম সম্পাদক।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি জীবন বাজি রেখে মাগুরা শহর থেকে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের গতিবিধির সংবাদ সংগ্রহ করে পাঠাতেন মুক্তাঞ্চলে থাকা তাঁর স্বামীর কাছে।
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে মহম্মদপুরে যান। সেখানে তিনি নারীদের সংগঠিত করেন, বিশেষত ভূমিহীন কৃষক পরিবারের নারীদের সাহস ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসায় নিরলস ভূমিকা রাখেন।
লুৎফুন নাহার হেলেনার জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর, মাগুরা শহরে। পিতা মুহাম্মদ ফজলুল হক, মাতা মোসাম্মৎ ছফুরা খাতুন। ১৪ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ষষ্ঠ। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও বইপ্রেমী। বাবার কাছ থেকেই পড়াশোনার প্রতি ভালোবাসা পান। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি নানা ধরনের সাহিত্য, রাজনীতি ও ইতিহাসের বই তাঁকে গড়ে তোলে এক সচেতন নাগরিক ও মানবিক চরিত্রে।
১৯৬৮ সালে বিএ পাস করে যোগ দেন মাগুরা সরকারি গার্লস হাইস্কুলে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি জড়িয়ে পড়েন বাম রাজনীতিতে এবং হয়ে ওঠেন নারীজাগরণের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
তাঁর জীবন ও মৃত্যু— বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনির্বাণ আলোকবর্তিকা।
বিউগল স্যালুট ও অফুরান ভালোবাসা—
তোমার আত্মত্যাগে আমরা ঋণী,
তোমার সাহসে আজও মুক্ত আকাশ দীপ্ত।
শ্রদ্ধাঞ্জলি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা লুৎফুন নাহার হেলেনা—
একাত্তরের আকাশে চিরজ্যোতিষ্ক এক তারা।
খবরওয়ালা/এমএজেড