“নোঙর তোলো তোলো, সময় যে হলো হলো…”—এক সময় এই গান উচ্চারিত হতো মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি রণাঙ্গনে। উৎসাহ, সাহস এবং দেশপ্রেমের এক অগ্নিস্রোত হিসেবে এই কণ্ঠ ছিল বাঙালির মুক্তির আহ্বান। সেই কণ্ঠের অধিকারী, যিনি কলম ও সুরের মাধুর্যে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামকে জীবন্ত করেছিলেন, আজ যেন সময়ের অন্তরালে বিস্মৃত—নয়ীম গহর।
একাত্তরের উত্তাল দিনে নয়ীম গহরের গান ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণার মন্ত্র। শত্রুর হৃদয়ে ভয়, মুক্তিযোদ্ধার মাঝে সাহস—সবই সৃষ্টি করেছিল তার সুরের মূর্ছনা। ২৫ মার্চের কালরাতে, নিজের জীবন বিপন্ন করে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে চট্টগ্রামে পৌঁছে দিয়েছিলেন এম. আর. সিদ্দিকীর হাতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। স্বাধীনতার স্বীকৃতি হিসেবে ২০১২ সালে তিনি পান স্বাধীনতা পদকসহ বহু সম্মাননা।
নয়ীম গহর ছিলেন গীতিকার, ঔপন্যাসিক, গায়ক, অভিনেতা, নাট্যকার এবং বিবিসি বাংলা ভাষ্যকার ও খবর পাঠক। বিক্রমপুর পরগনার সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৬ সালের ১৫ আগস্ট। শিক্ষা জীবনে মেধার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকে প্রথম স্থান অর্জন করেন।
কলমের জাদুতে ও সুরের মূর্ছনায় বাংলা সাহিত্য ও সংগীত জগতে রেখেছেন অনন্য স্বাক্ষর। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘শব ও স্বগতোক্তি’, ‘নিষিদ্ধ বিছানা’ এবং গল্পগ্রন্থ ‘রাহুগ্রাস’ তাঁর অন্তর্দীপ্ত সৃজনশক্তির সাক্ষ্য বহন করে। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত অসংখ্য কবিতা ও গল্প আজও ছিটিয়ে আছে স্মৃতির প্রান্তরে।
নয়ীম গহরের সৃষ্টি গান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। যেমন:
“নোঙর তোলো তোলো সময় যে হলো হলো”
“সাগর পাড়িতে ঝড় জাগে যদি জাগতে দাও”
“পুবের ওই আকাশে সূর্য উঠছে আলোকে আলোকময়”
“জয় জয় জয় জয় বাংলা”
“জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো”
দেশাত্মবোধক গানের পাশাপাশি তিনি লিখেছেন প্রায় দুই শতাধিক আধুনিক ও উচ্চাঙ্গ সংগীত। স্বাধীনতার পর তাঁর লেখা প্রথম নাটক ‘পাখি আমার জয়ন্ত’ বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। পরবর্তীতে ফজলে লোহানীর সঙ্গে নির্মাণ করেন জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’, যা তখনকার সময়ের নতুন ধারার সূচনা করেছিল।
এক সময় প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম নয়ীমকে নায়ক হিসেবে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। চলচ্চিত্র পত্রিকা রূপছায়া তাঁকে অভিহিত করেছিল: “সম্ভাবনাময় এক মুখ, যার পরিচয় একদিন সবাই জানবে।”
তাঁর রচিত গান “ইচ্ছে করেই যারা ভুল করেন, জেনেও না জানার ভান করেন” আজও মানুষের মুখে মুখে।
যুদ্ধ ও স্বাধীনতার উন্মেষের পর নয়ীম গহর বেছে নেন নিভৃত জীবন। শেষ জীবনে দিন কাটান নিরবতায়। ৭ অক্টোবর ২০১৫, এই প্রতিভাবান শিল্পী, এই বীর মুক্তিযোদ্ধা চিরশান্তিতে চেয়ে যান।
তাঁর উত্তরাধিকার বহন করছেন নাটক ও চলচ্চিত্রের বিশিষ্ট অভিনেত্রী ইলোরা গহর, যিনি আজও শিল্পের মঞ্চে চলেছেন তার পিতার মতো প্রতিভা ও দেশপ্রেমের পরিচয় বহন করে।
নয়ীম গহর—যিনি গানে, কলমে ও জীবনে ছিলেন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। তিনি হয়তো সময়ের অন্তরালে ভুলে যাওয়া প্রতিভা, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীলতা, সাহস ও অবদান চিরকাল বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে।
খবরওয়ালা/এমএজেড



