খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর ২০২৫
পাকিস্তানের যাত্রীবাহী ট্রেন জাফর এক্সপ্রেসে আবারও ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) সিন্ধু প্রদেশের সুলতান কোট রেলস্টেশনের কাছে রেললাইনে পেতে রাখা বিস্ফোরকে ট্রেনটির চারটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে অন্তত ৭ জন আহত হন।
পুলিশ জানায়, প্রায় পাঁচ পাউন্ড ওজনের ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) রেললাইনে স্থাপন করা হয়েছিল। কোয়েটাগামী ট্রেনটি তখন পেশোয়ার থেকে যাত্রা করেছিল। বিস্ফোরণে রেললাইনের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঘটনার পর সিন্ধুর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জিয়া-উল-হাসান লানজার দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, “রেললাইন ধ্বংসে জড়িত সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা হবে।”
অল্প সময়ের মধ্যেই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বেলুচ রিপাবলিকান গার্ডস (বিআরজি) হামলার দায় স্বীকার করে। সংগঠনটি দাবি করেছে, ওই ট্রেনে পাকিস্তানি সেনারা ভ্রমণ করছিলেন। বিআরজি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, “বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত এই ধরনের অভিযান চলবে।”
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট জানায়, শুধুমাত্র ২০২৫ সালেই জাফর এক্সপ্রেসে অন্তত সাতবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। কখনো বোমা বিস্ফোরণ, কখনো অপহরণ কিংবা গুলিবর্ষণ—সব মিলিয়ে ট্রেনটি এখন পাকিস্তানের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রীবাহী সেবা হিসেবে পরিচিত।
গত মার্চে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) বলান পাহাড়ি এলাকায় প্রায় ৪০০ যাত্রীসহ ট্রেনটি দখলে নেয়। ৩০ ঘণ্টার অচলাবস্থার পর সেনা অভিযানে ৩৩ জন বিদ্রোহী নিহত হয়। ওই অভিযানে ২৩ সেনা, তিন রেলকর্মী ও পাঁচ যাত্রী প্রাণ হারান।
এরপর আগস্টে মাস্তুং জেলায় আইইডি বিস্ফোরণে ট্রেনটির ছয়টি বগি লাইনচ্যুত হয়, যাতে আহত হন চারজন। একই মাসে কোলপুর ও সিবি রেলস্টেশনের কাছেও বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
বেলুচিস্তানকে পাকিস্তানের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করে রাখা জাফর এক্সপ্রেসে নিয়মিত যাতায়াত করেন সৈন্য ও সরকারি কর্মচারীরা। তাই ট্রেনটি সন্ত্রাসীদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তানের রেলমন্ত্রী হানিফ আব্বাসি দাবি করেছেন, “এসব হামলার পেছনে ভারতের মদদ রয়েছে।” তবে ভারত এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্রোহে জর্জরিত। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) ও গওয়াদার সমুদ্রবন্দরের কারণে অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্থানীয়রা অভিযোগ করে আসছে, ইসলামাবাদ তাদের সম্পদ লুট করছে, অথচ জনগণ দারিদ্র্যে ভুগছে।
বর্তমানে সক্রিয় বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ), বেলুচ রিপাবলিকান গার্ডস (বিআরজি) ও বেলুচ লিবারেশন ফ্রন্ট (বিএলএফ)। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বিএলএ-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেই বেলুচিস্তানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের অভিযোগ তুলেছে।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর থেকে বেলুচিস্তানে পর্যায়ক্রমে বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়েছে। বর্তমানে স্বাধীনতার দাবিতে পরিণত হওয়া এসব আন্দোলনের প্রধান টার্গেট হলো জাফর এক্সপ্রেস। তারপরও পাকিস্তান রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই ট্রেন বন্ধ করা হবে না। রেলমন্ত্রী আব্বাসি বলেন, ‘যত হামলাই হোক, ট্রেনটি সময় মেনে প্রতিদিনই চলবে।’