খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৫
গানের মায়াবী দুনিয়ায় যাঁর নাম উচ্চারণ মানেই এক অন্যরকম আবেশ, তিনি গীতা দত্ত। ‘তুমি যে আমার’, ‘এই সুন্দর স্বর্ণালি সন্ধ্যায়’, ‘মেরা নাম চিনচিন চু’, কিংবা ‘বাবুজি ধীরে চলনা’—এমন অসংখ্য অমর গানের কণ্ঠশিল্পী তিনি। অথচ আশ্চর্য হলেও সত্য, ভারতীয় সিনেমার এই কিংবদন্তির জন্ম বাংলাদেশের ফরিদপুরে, ১৯৩০ সালের ২৩ নভেম্বর। জমিদার দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ রায়চৌধুরীর দশ সন্তানের পঞ্চম সন্তান গীতা ছোটবেলা থেকেই সংগীতে মন দিয়েছিলেন। অঞ্চলের গুরু হরেন্দ্রনাথ নন্দীর কাছে তাঁর প্রথম তালিম, আর সেই তালিমই তৈরি করেছিল এক অনন্য কণ্ঠশিল্পীর ভিত।
পরিবার কলকাতা–আসাম হয়ে শেষ পর্যন্ত ১৯৪২ সালে মুম্বাইয়ে পাড়ি দেয়। আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে সংগীত শেখার আনুষ্ঠানিক উপায় বন্ধ হয়ে গেলেও গীতা ঠেকেননি। নিজের চর্চা, টিউশনি করে দিন চলছে—কিন্তু নিয়তি যেন অপেক্ষায় ছিল আরও বড় কিছু ঘটানোর। বারান্দায় বসে গান অনুশীলন করতে থাকা কিশোরী গীতার কণ্ঠ শুনে থমকে দাঁড়ান পণ্ডিত হনুমান প্রসাদ। সেখান থেকেই শুরু পেশাদার জীবনের। মাত্র ১৬ বছর বয়সে ‘ভক্ত প্রহ্লাদ’-এর কোরাস গান দিয়ে চলচ্চিত্রসঙ্গীতে তাঁর আবির্ভাব।
এর পরের গল্প যেন রূপকথা। শচীন দেববর্মনের ‘দো ভাই’-এ গাওয়া ‘মেরা সুন্দর স্বপ্না বিত গ্যায়া’ তাঁকে রাতারাতি জনপ্রিয় করে তোলে। গায়িকা হিসেবে তাঁর আবেগমথিত কণ্ঠ, দারুণ উচ্চারণ, এবং বাংলা টান তাঁকে আলাদা পরিচয় দেয়। লতা মঙ্গেশকর বা আশা ভোঁসলের যুগেও তিনি নিজস্ব স্থানে অটল হয়ে ছিলেন—কারণ, ‘গীতাকণ্ঠী হওয়া যায় না’, এই ধারণার জন্ম তাঁর কারণেই।
‘হারানো সুর’-এর ‘তুমি যে আমার’ এই কথাটিই আরও একবার প্রমাণ করেছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ধারণা ছিল, এই গান গীতা ছাড়া কেউ গাইতে পারবেন না—এবং তিনি ঠিকই ভেবেছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনে গীতার পরিচয় আরও আলোচনার জন্ম দেয় যখন তিনি বিয়ে করেন পরিচালক গুরু দত্তকে। সম্পর্কের টানাপোড়েন, ওয়াহিদা রহমানকে কেন্দ্র করে জটিলতা, গুরু দত্তের হতাশা—সব মিলিয়ে গীতার জীবনে নেমে আসে দুঃসময়। গানের রাজত্ব তখন লতা–আশার দখলে; তবুও গীতা তাঁর স্বতন্ত্র গায়কি দিয়ে ‘পেয়াসা’, ‘সিআইডি’, ‘আর পার’, ‘সাহেব বিবি গুলাম’—এমন অসংখ্য ছবিতে অমর হয়ে আছেন।
গুরু দত্তের মৃত্যু যেন তাঁর জীবনে সবচেয়ে বড় আঘাত। মানসিক অবসাদ, আর্থিক সংকট, যকৃতের রোগ—শেষ পর্যন্ত ১৯৭২ সালের ২০ জুলাই পর্দা পড়ে গায়িকার জীবনে। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ যেন আজও আকাশে ভেসে বেড়ায়; ‘তুমি যে আমার’—তার কাছে ভক্তদের চিরন্তন ফিসফিস, চিরন্তন আবেদন।