খাবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক নিয়োগ স্থগিত করার যে সিদ্ধান্ত সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার গ্রহণ করেছে, তা নানা দিক থেকে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দেশের প্রশাসনিক বিভিন্ন খাতে নীতিগত পরিবর্তন আনার প্রচেষ্টা চললেও, মনে রাখা জরুরি যে সব সিদ্ধান্তেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বজায় থাকতে হবে এবং সাধারণ জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা শুধু বিনোদন নয়; এগুলো শিশুর ব্যক্তিত্বকে পরিপূর্ণ করে। সংগীত শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে, সৃজনশীলতা বাড়ে এবং শৃঙ্খলাবোধ তৈরি হয়। একইভাবে, শারীরিক শিক্ষা শিশুদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। বর্তমানে অনেক তরুণ মানসিক অস্থিরতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, আর সেই অবস্থায় সংগীত ও খেলাধুলা তাদের মনের চাপ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এই শিক্ষাগুলো তাদেরকে পড়াশোনার চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি দেয় এবং শরীর ও মনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
বিশ্বের অনেক মুসলিম-প্রধান দেশেই সংগীত শিক্ষা বাধ্যতামূলক। উদাহরণ হিসেবে কুয়েতের কথা বলা যায়—দেশটির প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাপ্তাহিক সংগীত শিক্ষা বহু বছর ধরে পাঠ্যক্রমের অংশ। ১৯৫৮ সালে কুয়েত তাদের মিউজিক এডুকেশন সুপারভাইজর অফিস প্রতিষ্ঠা করে এবং একটি আনুষ্ঠানিক সংগীত পাঠ্যক্রম চালু করে। তুরস্কেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে পড়ানো হয় এবং ২০০৭ সালে তাদের পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ করে নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেন শিক্ষার্থীরা আরও সৃজনশীলভাবে শিখতে পারে।
বাংলাদেশের সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ইতোমধ্যে উদ্বেগজনকভাবে নিন্ম। ব্যক্তিত্ব বিকাশকারী বিষয়গুলো কমিয়ে দিলে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে, যা শিক্ষার মানকে আরও খারাপ অবস্থায় ঠেলে দিতে পারে। এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার মান কমানোর পাশাপাশি নতুন সামাজিক বৈষম্যেরও জন্ম দিতে পারে। বাংলাদেশের নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বহু শিশু সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ে। সেখানে সংগীত বা খেলাধুলার মতো বিষয় বাদ দিলে ধনী ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদের শিক্ষাজীবনের মধ্যে পার্থক্য আরও প্রকট হয়ে ওঠবে।
বাংলাদেশের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ সংগীত ও ক্রীড়া। জাতীয় সঙ্গীত থেকে শুরু করে লালন, নজরুল, রবীন্দ্রনাথসহ অসংখ্য সংগীতশিল্পী ও গীতিকারের সৃষ্টিতে আমাদের ঐতিহ্য গঠিত হয়েছে। একইভাবে, বাংলাদেশের ক্রীড়া—বিশেষ করে ক্রিকেট—আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গর্বের প্রতীক। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধাবী খেলোয়াড় তৈরির জন্য স্কুল পর্যায়ে খেলাধুলা অপরিহার্য। যদি শিশুদের এখনই খেলতে দেওয়া না হয়, তাহলে ৩০ বছর পর তারা কীভাবে বাংলাদেশকে গর্বিত করবে?
বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে সাম্যের ধারণা সংবিধানেই সংরক্ষিত। তাই এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ অগ্রহণযোগ্য, যা শিশুদের সৃজনশীলতা, স্বাধীন চিন্তা বা আনন্দময় শিক্ষাজীবনকে কমিয়ে দেয়। পাঠ্যক্রমের লক্ষ্য হওয়া উচিত—সংস্কৃতি, শিল্প, খেলাধুলা ও জ্ঞানের এমন সমন্বয় যা সকল শ্রেণির শিশুদের একসূত্রে গাঁথে।
বিশ্বের মুসলিম-প্রধান দেশগুলো যেখানে সংগীত ও খেলাধুলা সমন্বিত করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলছে, সেখানে বাংলাদেশকে উল্টো পথে হাঁটলে তা শিক্ষার মান আরও কমিয়ে দেবে। সংস্কার প্রয়োজন, তবে যেসব নীতি বা বিষয় দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের উপকার করে এসেছে, সেগুলো পুনর্বিবেচনার নামে বাদ দেওয়া উচিত নয়। পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ, অতিরিক্ত কার্যক্রমের জন্য অর্থায়ন বৃদ্ধি, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও বেতন কাঠামোর উন্নয়ন—এসবই শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বিদ্যমান বিষয় বাদ দেওয়া কখনো উন্নয়ন হতে পারে না।
| দেশ | সংগীত শিক্ষার বৈশিষ্ট্য | বছর বা নীতি |
|---|---|---|
| কুয়েত | সকল শিক্ষার্থীর জন্য সাপ্তাহিক সংগীত ক্লাস বাধ্যতামূলক | ১৯৫৮ সালে সংগীত তদারকি দপ্তর প্রতিষ্ঠা |
| তুরস্ক | প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত বাধ্যতামূলক | ২০০৭ সালে নতুন পাঠ্যক্রম প্রণয়ন |
| মালয়েশিয়া | জাতীয় পাঠ্যক্রমে সংগীত সমন্বিত | KSSR পাঠ্যক্রমে সমন্বিত উন্নয়ন লক্ষ্য |
খবরওয়ালা /এএসএন