খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২৫
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের চলমান আন্দোলনের কারণে সারা দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষকরা ২৭ নভেম্বর থেকে কর্মবিরতিতে আছেন। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার থেকে তাঁরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেছেন। ফলে দেশের বহু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়মিত বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত হয়ে পড়েছে; আবার কোথাও কোথাও প্রধান শিক্ষকরা নিজেরাই পরীক্ষার দায়িত্ব নিয়ে কোনো রকমে পরীক্ষা চালানোর চেষ্টা করছেন—যা পুরো ব্যবস্থাকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজারের বেশি; শিক্ষার্থী এক কোটির বেশি এবং শিক্ষক প্রায় পৌনে চার লাখ। এর মধ্যে সহকারী শিক্ষকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—৩ লক্ষাধিক শিক্ষক সরাসরি পাঠদান করেন এবং পরীক্ষার কাজ দেখাশোনা করেন। এই সংখ্যা থেকেই বোঝা যায়, সহকারী শিক্ষকদের আন্দোলন থেমে গেলে প্রাথমিকের সম্পূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা কার্যত থেমে যায়।
মেহেরপুরের একাধিক বিদ্যালয়ে বুধবার সকাল থেকেই দেখা গেছে তালাবদ্ধ শ্রেণিকক্ষ। পরীক্ষার সময় উপস্থিত হওয়া শিক্ষার্থীরা স্কুল গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থেকেও পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না। অনেকে হতাশ হয়ে অভিভাবকের সঙ্গে ঘরে ফিরে গেছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেমন ক্ষোভ, তেমনি অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে—কারণ বছরের শেষ পরীক্ষাটি না হলে ফল প্রকাশ ও পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তরণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে।
সহকারী শিক্ষক হামিদুল ইসলাম জানান, “উর্ধ্বতন নেতৃত্ব পরীক্ষাবর্জনের নির্দেশ দিয়েছে, তাই পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ নেই।” অন্যদিকে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন।
সিলেট, সুনামগঞ্জ ও ঢাকার চিত্র আবার ভিন্ন। সিলেটের কিছু বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক উপস্থিত হলেও তাঁরা শাটডাউন মানছেন না। আবার সুনামগঞ্জে অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকরা নিজেরাই পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন, যদিও তাঁরা এটিকে ‘অস্থায়ী ও অকার্যকর’ সমাধান বলেই মনে করছেন। ঢাকার বেশিরভাগ স্কুলেই নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা নিতে দেখা গেছে।
সহকারী শিক্ষকরা যে তিন দফা দাবি নিয়ে আন্দোলন করছেন তা হলো—
১) তাঁদের বেতন ১৩তম গ্রেড থেকে উন্নীত করে অন্তত ১১তম গ্রেডে আনা,
২) চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার জটিলতা দূর করা,
৩) সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি নিশ্চিত করা।
তাদের দাবি অনুযায়ী, বর্তমান বেতন কাঠামো প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রতি অন্যায় এবং অসঙ্গতিপূর্ণ। প্রাথমিক শিক্ষায় সরাসরি পাঠদানকারীরা সর্বনিম্ন বেতনগ্রেডে থাকায় তারা নিজেদের ‘অসম্মানিত’ বোধ করেন।
এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বুধবার এক বিবৃতিতে সহকারী শিক্ষকদের কর্মবিরতি প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বেতন উন্নীতকরণ এবং পদোন্নতির বিষয়গুলো ইতিমধ্যে পে কমিশন, জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয় বিবেচনায় নিয়েছে। কিন্তু পরীক্ষা বর্জন ও শাটডাউন কর্মসূচি সরকারি চাকরি আচরণবিধির পরিপন্থী এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন করে—এ মন্তব্যও করা হয়েছে বিবৃতিতে।
একই সঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা বন্ধ রাখতে বাধা প্রদান, বিদ্যালয়ে তালা লাগানো ও সহকর্মীদের ওপর হামলার মতো কর্মকাণ্ড শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ইতিমধ্যে কয়েকজন শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে দেশের প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাজগৎ এখন এক সংকটময় সময়ে দাঁড়িয়ে। শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি পূরণ না হলে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাদান, পরীক্ষার সময়সূচি, ফল প্রকাশ—সবই অনিশ্চয়তায় পড়ে যাবে। আর আন্দোলন চলতে থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কোমলমতি শিক্ষার্থীরাই।