খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২৫
পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি ভূমিকম্পের বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচশো থেকে এক হাজার বছরে এ অঞ্চলে বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্প হয়নি, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এ অঞ্চলে প্রাণহানির সম্ভাবনা বেড়ে যাবে এবং ক্ষয়-ক্ষতি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
পুরো জেলাটি পাহাড়ে ঘেরা, এখানে সমতল ভূমি নেই। সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয়রা পাহাড়ের পাদদেশ কেটে সমান করে অট্টালিকা নির্মাণ করেছেন।
তথ্য অনুযায়ী, রাঙ্গামাটির জেলায় ২০ হাজারের বেশি সরকারি, বেসরকারি ও জনসাধারণের ভবন রয়েছে। অধিকাংশ ভবন বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি হয়নি। ফলে বড় ধরনের ভূমিকম্পে এসব ভবন এবং সেখানে থাকা মানুষ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের মানচিত্র ও বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার অংশবিশেষ দেশের ভূমিকম্পের সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জোন-১-এ পড়ে। এ অঞ্চল ডাউকি ফল্ট লাইনের কাছাকাছি অবস্থিত, যা বড় ধরনের ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে।
২০০৩ সালের ৬ আগস্ট ভারতের মিজোরাম সীমান্তবর্তী রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলায় দু’দফায় ভূমিকম্প হয়েছিল। প্রথমটি সকাল ৬:৩০ এবং দ্বিতীয়টি ১১:২০ মিনিটে। এটি মাঝারি আকারের ভূমিকম্প ছিল, যার তীব্রতা ছিল রিখটার স্কেলে ৫.৬ এবং প্রায় ৪ সেকেন্ড স্থায়ী ছিল। এ ঘটনায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
২০০৮ সালের জানুয়ারিতে একই উপজেলায় ১৮ বার ভূমিকম্প হয়েছে। ১৩ ও ৩০ জানুয়ারি পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রামসহ পার্বত্য তিন জেলায় ঝাঁকুনি অনুভূত হলেও বরকলেই ১৮ বার ভূমিকম্প হয়।
ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে তিনটি জোনে ভাগ করা হয়েছে; পার্বত্য জেলাগুলো জোন-১-এ আছে। বারবার ভূমিকম্পের কারণে বরকলের সরকারি স্থাপনা ও কয়েকটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৬ প্রতিবছর ছোট-বড় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।
ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা বলেন, ২০০৮ সালের ১৩ জানুয়ারি বরকলে মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প প্রায় ২৫–৩০ সেকেন্ড স্থায়ী ছিল। উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী। রাঙ্গামাটির মানুষ বেশি মাত্রায় ভূমিকম্প অনুভব করেছে। রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৪.৯।
২০২১ সালের ২৬ নভেম্বর ভোর ৫:৪৫ মিনিটে দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো রাঙ্গামাটিতেও ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৬.২। এই ঘটনায় পুরানবস্তি-ঝুলুইক্যা সংযোগ সেতু এবং একটি মসজিদে ফাটল দেখা দেয়, তিনজন আহত হয়।
২০২৪ সালের ২ জুন দুপুর ২:৪৪ মিনিটে মিয়ানমারের মাওলাইদ এলাকায় ভূমিকম্পে রাঙ্গামাটি কেঁপেছিল। রিখটার স্কেলে মাত্রা ৫। ২৯ মে একই বছরে আরও একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়, মাত্রা ৫.৪। ৩১ জুলাই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৪.৭। ১ ডিসেম্বর রাত ১২:৫৫ মিনিটে রাঙ্গামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলা কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে ভূমিকম্প অনুভূত হয়, মাত্রা ৪.৯।
রাঙ্গামাটি প্রেস ক্লাবের সভাপতি আনোয়ার আল হক বলেন, ভূমিকম্প থেকে বাঁচতে হলে ভবন নির্মাণের সময় বিল্ডিং কোড মানা প্রয়োজন। সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো উচিত।
পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ সুবর্ণ চাকমা জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা হলেও এরপর কোন বৈঠক হয়নি। নতুন আইনে জেলা পর্যায়ে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা ভবন নির্মাণ অনুমতি দেবে। পৌরসভা সর্বোচ্চ ৭০–৭৫ ফুট উচ্চতা (৬ তলা) ভবন অনুমোদন দিতে পারে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ ও পৌরসভা ভূমিকম্প সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, ভূমিকম্পের আগাম সংকেত নেই। তবে ক্ষয়-ক্ষতি কমানো সম্ভব। চলতি বছরের ২১ নভেম্বর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ১০ জন নিহত হয়।
খবরওয়ালা /এসএস