খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের প্রতি নতুন নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ঋণ পুনঃ তফসিল, অবলোপন এবং এককালীন পরিশোধসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার পরও খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে না কমায় বিষয়টির ব্যাখ্যা চেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। একই সঙ্গে চলতি মাসের মধ্যেই খেলাপি ঋণকে দৃশ্যমানভাবে কমিয়ে আনার নির্দেশও প্রদান করা হয়েছে।
রবিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আয়োজিত ব্যাংকার্স সভায় এ নির্দেশনা প্রদান করা হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, সংশ্লিষ্ট ডেপুটি গভর্নরগণ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা। সভায় জানানো হয়, পূর্ববর্তী সরকারের পতনের পর থেকে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ প্রায় সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে দেওয়া ঋণের পাশাপাশি পালিয়ে যাওয়া ব্যবসায়ী এবং অনেক সৎ উদ্যোক্তাও বিভিন্ন কারণে খেলাপির তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। ঋণ নীতিমালার কঠোরতা বাড়ানোর পর খেলাপি ঋণ আরও বেড়ে গেছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন নিজ উদ্যোগে সমস্যা সমাধানে ব্যাংকগুলোকে তৎপর হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষি ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় উদ্বেগ জানিয়ে এ খাতে ঋণ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে উপস্থাপিত তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে পঞ্চাশটি বড় শিল্প গোষ্ঠীসহ পঞ্চাশ কোটি টাকা বা তার বেশি অঙ্কের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে দশ লাখ বায়ান্ন হাজার কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের প্রায় তেষট্টি শতাংশ। অন্যদিকে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের সাতাত্তর শতাংশ বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছে আটকে আছে। বড় অঙ্কের এসব ঋণের বিপরীতে জামানত রয়েছে মাত্র দুই লাখ পঁচাশি হাজার কোটি টাকার মতো, যা মোট ঋণের এক চতুর্থাংশেরও কম।
সভায় আরও জানানো হয়, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। এ কারণে ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ে তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি মামলা দায়েরও বাড়িয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত প্রায় সাতানব্বই হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ব্যাংকগুলো চৌদ্দ হাজার ছয়শ বাষট্টিটি মামলা করেছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে মামলায় আটকে আছে চার লাখ সাত হাজার কোটি টাকার বেশি। জুন শেষে অর্থঋণ আদালতে মোট মামলা দাঁড়িয়েছে দুই লাখ বাইশ হাজারের বেশি।
সভায় মামলার স্থগিতাদেশ শূন্যে নামিয়ে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়। জানা যায়, ঋণ সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা চার থেকে বাড়িয়ে সাতটি করা হয়েছে। পালিয়ে যাওয়া অধিকাংশ বড় ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধেও ব্যাংকগুলো মামলা করেছে।
সভায় আরও উপস্থাপন করা হয় বিশেষ সুবিধায় মাত্র দুই শতাংশ টাকা জমা দিয়ে দশ বছর মেয়াদে নেওয়া পুনঃ তফসিল সুবিধার অগ্রগতি। এতে দেখা যায়, পাঁচ সদস্যের কমিটির কাছে এক হাজার পাঁচশ ষোলোটি আবেদন এসেছে, যার ঋণের পরিমাণ এক লাখ ছিয়ানব্বই হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শীর্ষ বিশ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এক লাখ দশ হাজার কোটির বেশি পুনঃ তফসিলের আবেদন করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন পর্যন্ত তিনশ ব্যবসায়ীর নয়শ আবেদন নিষ্পত্তি করেছে, তবে ব্যাংকগুলো মাত্র ২৫০টি আবেদনের বিপরীতে ২৬ হাজার কোটির মতো ঋণ পুনঃ তফসিল করেছে। এ প্রক্রিয়ার ফলে তেরো হাজার সাতশত কোটি টাকার মতো খেলাপি ঋণ কমেছে।
খবরওয়ালা /এজে