খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২৬
গালফ অব ফিনল্যান্ডে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাবমেরিন টেলিযোগাযোগ কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় ফিনল্যান্ড ও এস্তোনিয়ার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক তদন্ত জোরদার করেছে। নর্ডিক ও বাল্টিক অঞ্চলকে সংযুক্তকারী এই কৌশলগত জলপথটি দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপের অন্যতম সংবেদনশীল সামুদ্রিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। সমুদ্রতলের বিদ্যুৎ লাইন, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ডেটা কেবল এবং জ্বালানি পাইপলাইনের ঘন উপস্থিতি এ অঞ্চলকে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সাম্প্রতিক এই ঘটনা ওই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা ও নজরদারি ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বুধবার ভোরে হেলসিঙ্কি ও তাল্লিনের মধ্যবর্তী সাবমেরিন কেবল রুটে হঠাৎ কারিগরি ত্রুটি শনাক্ত হয়। বিষয়টি নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ফিনল্যান্ড ও এস্তোনিয়ার নৌ কর্তৃপক্ষ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং বিশেষায়িত অপরাধ তদন্ত সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ শুরু করে। ফিনল্যান্ডের বর্ডার গার্ড জানায়, সন্দেহভাজন একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে ফিনল্যান্ডের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের (ইইজেড) ভেতরে নোঙর অবস্থায় আটক করে তল্লাশি চালানো হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে জাহাজটি দীর্ঘ সময় ধরে নোঙর টেনে চলছিল, যা সমুদ্রতলের কেবল ও পাইপলাইনের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে হেলসিঙ্কি পুলিশ ‘গুরুতর অপরাধমূলক ক্ষতি’, ‘ক্ষতির চেষ্টা’ এবং ‘টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় মারাত্মক হস্তক্ষেপ’-এর অভিযোগে ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তকারীরা নোঙরের চিহ্ন, নাবিকদের চলাচল এবং নেভিগেশন ডেটা বিশ্লেষণ করছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত কেবলটির মালিক ফিনল্যান্ডের শীর্ষস্থানীয় টেলিকম অপারেটর এলিসা। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, কেবলটি রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ আন্ডারওয়াটার অবকাঠামোর তালিকাভুক্ত। যদিও ক্ষতির সুনির্দিষ্ট স্থানটি এস্তোনিয়ার অর্থনৈতিক জলসীমার মধ্যে, সীমান্ত অতিক্রমকারী নেটওয়ার্ক হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ কারিগরি ও নিরাপত্তা সমন্বয় বজায় রাখা হচ্ছে। এলিসার দাবি, বিকল্প সংযোগ ও রিডানডেন্সি ব্যবস্থার কারণে গ্রাহকসেবায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি।
তদন্তের আওতায় থাকা জাহাজটি ‘ফিটবার্গ’, যা সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড দ্য গ্রেনাডিনসের পতাকাবাহী। জাহাজটি রাশিয়া থেকে ইসরায়েলের পথে যাত্রারত ছিল বলে জানানো হয়েছে। ১৪ সদস্যের নাবিকদলের মধ্যে রাশিয়া, জর্জিয়া, আজারবাইজান ও কাজাখস্তানের নাগরিক রয়েছেন এবং সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। ফিনল্যান্ডের জাতীয় পুলিশ কমিশনার ইল্কা কোসকিমাকি স্পষ্ট করে বলেছেন, এ পর্যায়ে কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।
এদিকে প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, ফিনল্যান্ড সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়লে কঠোর ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর বাল্টিক সাগর অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো রুশ জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে উদ্যোগ নেওয়ায় সাবমেরিন কেবল ও পাইপলাইনের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর নিরাপত্তা বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগেও ২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর ফিনল্যান্ড–এস্তোনিয়া রুটে কেবল ক্ষতির ঘটনায় তেলবাহী জাহাজ ‘ইগল এস’-এর ক্যাপ্টেনসহ তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। একই সময়ে সুইডিশ অপারেটর আরেলিয়নও পৃথক কেবল ক্ষতির কথা জানায়, যার মেরামত আবহাওয়া অনুকূলে এলে শুরু হওয়ার কথা।
| তারিখ | কেবল মালিক | অবস্থান | সন্দেহভাজন জাহাজ | সেবায় প্রভাব |
|---|---|---|---|---|
| বুধবার | এলিসা (ফিনল্যান্ড) | গালফ অব ফিনল্যান্ড (এস্তোনিয়ার ইইজেড) | ফিটবার্গ | উল্লেখযোগ্য প্রভাব নেই |
| মঙ্গল–বুধবার | আরেলিয়ন (সুইডেন) | গালফ অব ফিনল্যান্ড / বাল্টিক সাগর | তদন্তাধীন | সীমিত বিঘ্ন |
| ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ | একাধিক অপারেটর | ফিনল্যান্ড–এস্তোনিয়া রুট | ইগল এস | আংশিক বিঘ্ন |
সব মিলিয়ে, ধারাবাহিক এসব ঘটনা ইউরোপজুড়ে সমুদ্রতলের অবকাঠামো সুরক্ষায় উন্নত নজরদারি, কঠোর নৌ-নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত নিরাপত্তা কৌশলের জরুরি প্রয়োজনকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।