খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩ জানুয়ারি ২০২৬
‘আমাকে যেন ভুলে না যাও… তাই একটা ছবি পোস্ট করে মুখটা মনে করিয়ে দিলাম।’ ২০১৮ সালের শুরুর দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের এই আর্তি আজ আমাদের হৃদয়ে এক গভীর হাহাকার তৈরি করে। গত ১ জানুয়ারি ছিল এই বরেণ্য সুরস্রষ্টা ও বীর মুক্তিযোদ্ধার ৭০তম জন্মদিন। নিভৃতচারী এই মানুষটি নিভৃতেই চলে গেছেন ২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সুরের বৃষ্টি আজও বাংলা গানের আকাশকে সিক্ত করে রাখে।
১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকার আজিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন এই বিস্ময়কর প্রতিভা। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দেশপ্রেমের অগ্নিমন্ত্রে। ১৯৭১ সালে যখন দেশমাতৃকার ডাকে আপামর জনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন বুলবুলের বয়স ছিল মাত্র সাড়ে ১৪ বছর। আজিমপুর স্কুল থেকে পালিয়ে কিশোর বয়সেই তিনি যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধের সেই রক্তক্ষরণ, দ্রোহ এবং বিজয় পরবর্তী শূন্যতা ও হাহাকার—সবই তাঁর সুরের পরতে পরতে মিশে আছে। যুদ্ধ থেকে ফিরে তিনি রাইফেল ছেড়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন গিটার। টানা আট বছর তিনি কেবল দেশের গান তৈরি করেছেন, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে দিয়েছিল নতুন প্রাণের স্পন্দন।
১৯৭৮ সালে ‘মেঘ বিজলি বাদল’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালক হিসেবে তাঁর অভিষেক ঘটে। তবে ১৯৮৪ সালে ‘নয়নের আলো’ চলচ্চিত্রের গানগুলো তাঁকে পৌঁছে দেয় জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন খুব কমই হয়েছে যে, একটি ছবির সবকটি গানই কালজয়ী মর্যাদা পেয়েছে। তাঁর সুর করা তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে তিনি যেমন ক্ল্যাসিকাল ও ফোককে আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়েছেন, তেমনি বিরহ ও প্রেমের সংজ্ঞাকেও বদলে দিয়েছেন।
একনজরে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের কর্মজীবন ও অর্জন:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| জন্ম ও মৃত্যু | ১ জানুয়ারি ১৯৫৬ — ২২ জানুয়ারি ২০১৯ |
| মুক্তিযুদ্ধ | ২ নম্বর সেক্টরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা |
| অভিষেক (চলচ্চিত্র) | মেঘ বিজলি বাদল (১৯৭৮) |
| উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র | নয়নের আলো, আম্মাজান, প্রেমের তাজমহল |
| জাতীয় পুরস্কার | জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (সংগীত পরিচালনা ও সুরকার) |
| রাষ্ট্রীয় সম্মান | একুশে পদক (২০১০) |
| কালজয়ী দেশাত্মবোধক গান | সব কটা জানালা খুলে দাও না, সেই রেললাইনের ধারে |
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল কেবল একজন সুরকার বা গীতিকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রজন্মের পর প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের পরম আশ্রয়স্থল। জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘ক্লোজআপ ওয়ান’-এর বিচারক হিসেবে তিনি তরুণ প্রতিভাদের খুঁজে বের করেছেন এবং তাঁদের পিতৃতুল্য স্নেহে গড়ে তুলেছেন। কণ্ঠশিল্পী সালমা, মনির খান কিংবা কনকচাঁপার মতো গুণী শিল্পীদের ক্যারিয়ারের ভীত মজবুত করার পেছনে বুলবুলের অবদান অনস্বীকার্য।
ফেসবুকের সেই শেষ পোস্টে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন মানুষ হয়তো তাঁকে ভুলে যাবে। কিন্তু গতকাল তাঁর জন্মদিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তদের অজস্র ভালোবাসা ও স্মৃতিচারণ প্রমাণ করেছে—যিনি ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’ কিংবা ‘মাগো আর তোমাকে ঘুমপাড়ানি মাসি হতে দেব না’র মতো গান সৃষ্টি করেছেন, তাঁকে ভোলা বাঙালি জাতির পক্ষে অসম্ভব। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল তাঁর সুরের মাঝে অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন।