খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি ২০২৬
রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় একটি সাধারণ আবাসিক ভবনে অত্যন্ত উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল একটি মাদকের ল্যাবরেটরি। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে তৌসিফ হাসান (২২) নামের এক যুবক তাঁর পৈত্রিক বাড়িতে অপ্রচলিত মাদক ‘কুশ’ বা উন্নত জাতের মারিজুয়ানা চাষ করছিলেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, বিদেশে অবস্থানকালেও তৌসিফ দূরনিয়ন্ত্রিত (রিমোট কন্ট্রোল) যন্ত্রের মাধ্যমে এই ল্যাবের তাপমাত্রা এবং পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতেন। সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) এক ঝটিকা অভিযানে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
অভিযানের সূত্রপাত ও ইয়াবা জব্দ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা গোয়েন্দা কার্যালয়ের একটি দল গত মঙ্গলবার গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয়ে অভিযান চালায়। গোয়েন্দা তথ্যে জানা গিয়েছিল যে, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিদেশে মাদক পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছে। অভিযানে একটি পার্সেলে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা ৩২টি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। এই পার্সেলটি গত ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকোতে পাঠানোর জন্য বুকিং দেওয়া হয়েছিল।
সিসিটিভি ফুটেজ এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ডিএনসি কর্মকর্তারা ওই পার্সেল প্রেরণকারী তরুণীকে শনাক্ত করেন। পরে ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়ে তৌসিফের ওই বান্ধবীকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওয়ারী এলাকায় তৌসিফের বাসায় হানা দেয় গোয়েন্দারা এবং সেখান থেকে বাসার তত্ত্বাবধায়ক মো. রাজু শেখকে (৩৯) গ্রেফতার করা হয়।
অভিযানে উদ্ধারকৃত মাদক ও সামগ্রীর বিবরণ নিচের সারণিতে দেওয়া হলো:
| ক্রমিক | উদ্ধারকৃত সামগ্রী | বিস্তারিত বিবরণ |
|---|---|---|
| ১. | ইয়াবা ট্যাবলেট | ৩২টি (কুরিয়ারে পাচারের সময় জব্দ)। |
| ২. | কুশ (Kush) | ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আনা বীজ, পূর্ণাঙ্গ গাছ ও সদ্য সংগৃহীত পাতা। |
| ৩. | মাদক ল্যাব সরঞ্জাম | তাপমাত্রানিয়ন্ত্রিত ঘর, টিন ও ফয়েল পেপার দ্বারা আবৃত সেটআপ। |
| ৪. | স্মার্ট প্রযুক্তি | ইন্টারনেট চালিত সিসি ক্যামেরা ও দূরনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রক যন্ত্র। |
| ৫. | অন্যান্য মাদক | বিদেশি মদ এবং সিসা সেবনের বিভিন্ন আধুনিক সরঞ্জাম। |
তৌসিফের ব্যক্তিগত জীবন ও মাদক চাষের কৌশল
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তৌসিফ হাসান যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং তিনি সান ফ্রান্সিসকোতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। বছরে কয়েকবার তিনি বাংলাদেশে আসতেন। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করা তৌসিফ ‘ও’ লেভেল সম্পন্ন করার পর যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন বেশ ট্র্যাজিক; বাবা মারা যাওয়ার পর মা অন্য জায়গায় চলে যাওয়ায় তিনি মূলত দাদা-দাদির কাছে বড় হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালীন তিনি উন্নত জাতের মাদক ‘কুশ’ চাষের কলাকৌশল আয়ত্ত করেন।
ওয়ারীর বাসার ছাদে তিনি টিন ও ফয়েল পেপার দিয়ে একটি বিশেষ ঘর তৈরি করেছিলেন। সেখানে সূর্যালোক ছাড়াই কৃত্রিম আলো এবং নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় মাদক চাষ চলত। বাংলাদেশে অবস্থান না করলেও তিনি বিদেশ থেকে অ্যাপের মাধ্যমে এই চাষের অগ্রগতি তদারকি করতেন। তাঁর এই কাজে বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন তাঁর পুরোনো স্কুলবান্ধবী এবং বাসার তত্ত্বাবধায়ক রাজু।
আইনি পদক্ষেপ ও বর্তমান পরিস্থিতি
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানের পর আসামিদের বিরুদ্ধে টঙ্গী পশ্চিম থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তৌসিফের বান্ধবীকে ইয়াবা সরবরাহের অভিযোগে রাজু শেখকে গ্রেফতার করা হলেও মূল হোতা তৌসিফ বর্তমানে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের সঙ্গে আর কারা জড়িত এবং এর আগে কতবার এভাবে মাদক লেনদেন হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দারা।
অপ্রচলিত ও ব্যয়বহুল এই মাদকের ব্যবহার বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।