খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি ২০২৬
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ধারাবাহিক অভিযোগ তুলে ধরছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই তারা দাবি করছে, নির্বাচনী পরিবেশ সমতাভিত্তিক বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নয়। এই অবস্থায় রাজনৈতিক মহলে জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে—এই জোট কি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ-উর রহমান মনে করেন, নির্বাচন বর্জনের সম্ভাবনা একেবারে নাকচ করা যায় না, যদিও এখনো তা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে রূপ নেয়নি। তাঁর মতে, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পর এবং প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন হলেও অতীতে একাধিক জোট ও দল নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর নজির রয়েছে। ফলে আইনগত বা প্রক্রিয়াগত বাধা এখানে বড় বিষয় নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত ও এনসিপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের একটি অংশ কার্যত বিএনপির পক্ষে কাজ করছে। এমনকি জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. আব্দুল্লাহ মো. তাহের নির্বাচন কমিশনে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, প্রকাশ্য আলোচনায় এমন বক্তব্যও শোনা যাচ্ছে—তারেক রহমানকে ক্ষমতায় আনাই যেন মূল লক্ষ্য। এসব বক্তব্য রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও উসকে দিয়েছে।
জাহেদ-উর রহমান মনে করেন, এই অভিযোগগুলোর পেছনে দুটি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা আরও সতর্ক ও নিরপেক্ষ ভূমিকা নিতে বাধ্য হয়। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে নির্বাচন বর্জনের যৌক্তিক ভিত্তি তৈরি করা। তাঁর ভাষায়, “যদি বারবার বলা হয় নির্বাচনী মাঠ সমতাভিত্তিক নয়, তাহলে একসময় বলা সহজ হয়—এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো অর্থ নেই।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমান নির্বাচনী বাস্তবতা অতীতের অনেক নির্বাচনের তুলনায় বেশি ভারসাম্যহীন বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপির সম্ভাব্য বিজয় অনেক আগেই অনুমানযোগ্য হয়ে পড়েছে, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে বিরল।
নিচের টেবিলে অতীতের কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র তুলে ধরা হলো—
| নির্বাচন বছর | রাজনৈতিক পরিবেশ | ফলাফল সম্পর্কে পূর্বানুমান |
|---|---|---|
| ১৯৯১ | তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ | অনিশ্চিত |
| ১৯৯৬ | তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা | অনিশ্চিত |
| ২০০১ | শক্ত প্রতিযোগিতা | সীমিত পূর্বানুমান |
| বর্তমান | স্পষ্টভাবে একতরফা প্রবণতা | আগাম বিজয় অনুমানযোগ্য |
এই বিশ্লেষকের মতে, আগাম বিজয়ের এই ধারণা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এমনকি গণমাধ্যমের একটি অংশকে তথাকথিত ‘সূর্যমুখী প্রবণতা’র দিকে ঠেলে দিতে পারে—অর্থাৎ সম্ভাব্য ক্ষমতাকেন্দ্রের দিকে স্বতঃস্ফূর্ত ঝোঁক সৃষ্টি হতে পারে। এটি নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বড় ঝুঁকি।
জামায়াত-এনসিপি জোটের আরেকটি গভীর উদ্বেগ হলো আসনসংখ্যা। যদি তারা বুঝতে পারে প্রত্যাশিত আসনের এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশও পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাহলে সংসদের ভেতরে কার্যকর বিরোধী রাজনীতি করা কঠিন হয়ে পড়বে। এতে দলের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও সমর্থকদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন বর্জনের হুমকি একটি ‘আলটিমেট বার্গেইনিং টুল’ হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে বলে মনে করেন জাহেদ-উর রহমান। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্বাচনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিলে দেশ অজানা রাজনৈতিক পথে প্রবেশ করতে পারে, যার ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের ওপরই বেশি পড়বে।
জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতে নির্বাচন পুরোপুরি একতরফা বলে চিহ্নিত করা কঠিন হবে। যদিও এটিকে আদর্শ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন বলা যাবে না, তবু তাদের উপস্থিতি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা কিছুটা হলেও বাড়ায়।
সবশেষে তাঁর আহ্বান—রাজনৈতিক ফলাফল প্রত্যাশামতো না হতে পারে, এই আশঙ্কায় কোনো দলেরই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে সরে যাওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন সব সময়ই ছিল, এমনকি তুলনামূলক ভালো নির্বাচনগুলোর ক্ষেত্রেও। সেই বাস্তবতা মেনে নিয়েই নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ।