খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২৬
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে জাতিসমূহের মধ্যে যে জোটবদ্ধ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরি হয়েছিল, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তা এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। গত এক দশকে বিশ্বরাজনীতির মেরুকরণ এমনভাবে পরিবর্তিত হয়েছে যা আধুনিক ইতিহাসের সকল রাজনৈতিক রীতি ও প্রথাকে লঙ্ঘন করেছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণ এবং গত এক বছরের তাঁর কর্মকাণ্ড বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার প্রতিটি ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ১৯৪৫ সালের পর বিশ্বব্যবস্থা এতটা তীব্র ‘ঝাঁকুনি’ আর কখনো খায়নি।
ইউরোপের দেশগুলোর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা নিশ্চিন্তকারী ৭৬ বছরের পুরনো সামরিক জোট ‘ন্যাটো’ এখন ভাঙনের মুখে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের পেশিশক্তি প্রদর্শন এবং গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের মতো অপ্রত্যাশিত আকাঙ্ক্ষা ইউরোপীয় নেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) বার্ষিক সভায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক আইন পদদলিত হচ্ছে এবং একমাত্র ‘পেশিশক্তি’ই কার্যকর আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তাঁর মতে, নতুন করে সাম্রাজ্যবাদী লিপ্সা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা বৈশ্বিক শান্তির জন্য বড় হুমকি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে। পারস্পরিক শুল্ক আরোপের মাধ্যমে তিনি বিশ্বের প্রায় ৯০টির বেশি দেশকে বিপাকে ফেলেছেন। এই শুল্ক যুদ্ধের প্রধান শিকার হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত।
বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর মার্কিন শুল্কের প্রভাব:
| লক্ষ্যবস্তু দেশ/অঞ্চল | বর্তমান/প্রস্তাবিত শুল্ক হার | কারণ ও প্রেক্ষাপট |
| ভারত | ৫০% (বর্তমানে), ৫০০% (প্রস্তাবিত) | রাশিয়ার তেল কেনা ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নীতি। |
| ফ্রান্স | ২০০% পর্যন্ত (হুমকি) | গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে বিরোধিতার পাল্টা ব্যবস্থা। |
| চীন ও রাশিয়া | ৫০০% (প্রস্তাবিত) | জ্বালানি খাত ও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার। |
| দক্ষিণ এশিয়া | ক্রমবর্ধমান শুল্কের বোঝা | মার্কিন সংরক্ষণবাদী বাণিজ্য নীতি। |
মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের তথাকথিত ‘শান্তি পরিকল্পনা’ আসলে কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি। মিসরে আয়োজিত শান্তি সম্মেলনের মাধ্যমে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও, তা স্থায়ী হয়নি। গাজায় পুনরায় হামলা শুরু হওয়া এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি মধ্যপ্রাচ্যকে এক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করেছে। অন্যদিকে, লাতিন আমেরিকায় ভেনেজুয়েলার তেল ভাণ্ডারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা এবং মেক্সিকো বা কিউবার ওপর সামরিক হুমকির কারণে আমেরিকাস অঞ্চলে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই একপাক্ষিক নীতির কারণে তাদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী কানাডাও এখন বিকল্প খুঁজছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সম্প্রতি চীন সফর করেছেন এবং সরাসরি বলেছেন যে, ভৌগোলিক অবস্থান এখন আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না। তিনি মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে (যেমন- অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া) ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
পাশাপাশি, রাশিয়া ও চীনও একটি ‘নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’র স্বপ্ন দেখাচ্ছে। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) সম্মেলনে শি জিনপিং স্পষ্ট করেছেন যে, আধিপত্যবাদ ও ক্ষমতার রাজনীতির বিরুদ্ধে বিশ্বকে একটি নতুন মোড়ে দাঁড়াতে হবে। বেইজিং এখন মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রণোদনার প্রস্তাব দিচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনপদ্ধতিকে অনেকেই ‘মাফিয়া ধাঁচের’ ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করছেন, যেখানে সামষ্টিক মূল্যবোধের চেয়ে আর্থিক লাভ ও ব্যক্তিগত আধিপত্য বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্বনেতারা যখন ডাভোসে সমবেত হচ্ছেন, তখন এটি স্পষ্ট যে পুরনো বিশ্বব্যবস্থা আর আগের রূপে ফিরে আসবে না। এখন দেখার বিষয়, বিশ্ব কি চীনের নেতৃত্বাধীন নতুন কোনো জোটের দিকে ঝুঁকবে, নাকি মধ্যম শক্তির দেশগুলো মিলে একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে সক্ষম হবে।