খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
বঙ্গোপসাগরের গহিন জলসীমায় নিখোঁজ হওয়ার হাত থেকে বেঁচে ফেরা বাংলাদেশি জেলে আব্দুল মান্নানকে (২২) তাঁর পরিবারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর গত শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি, ২০২৬) কক্সবাজারের মহেশখালী নিবাসী এই যুবককে তাঁর স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই আনন্দদায়ক সংবাদটি নিশ্চিত করেছেন।
গত ১৩ জানুয়ারি কক্সবাজার জেলার মহেশখালী থানাধীন ডালঘাট এলাকা থেকে একটি ফিশিং বোট নিয়ে আব্দুল মান্নানসহ একদল জেলে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। কয়েক দিন সমুদ্রে অবস্থানের পর গত ১৮ জানুয়ারি সকালে ঘন কুয়াশা বা দিকভ্রান্ত হওয়ার কারণে বোটটি অসাবধানতাবশত আন্তর্জাতিক জলসীমা অতিক্রম করে ভারতীয় জলসীমায় প্রবেশ করে। এ সময় ভারতীয় কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘কমলা দেবী’ অনুপ্রবেশকারী বোটটিকে ধাওয়া করলে আতঙ্কিত হয়ে আব্দুল মান্নান বোট থেকে গভীর সমুদ্রে পড়ে যান।
ভারতীয় কোস্ট গার্ডের সদস্যরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে আব্দুল মান্নানকে সমুদ্র থেকে জীবিত উদ্ধার করেন। পরবর্তীতে দুই দেশের কোস্ট গার্ডের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তিতে এবং মানবিক বিবেচনায় তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।
আব্দুল মান্নান উদ্ধার ও হস্তান্তরের কালানুক্রম:
| তারিখ ও সময় | ঘটনার বিবরণ | অংশগ্রহণকারী সংস্থা |
| ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | মহেশখালীর ডালঘাট থেকে যাত্রা শুরু। | স্থানীয় ফিশিং বোট ও জেলেরা। |
| ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ | ভারতীয় জলসীমায় প্রবেশ ও সমুদ্র থেকে উদ্ধার। | ভারতীয় কোস্ট গার্ড (জাহাজ কমলা দেবী)। |
| ২২ জানুয়ারি ২০২৬ | বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে হস্তান্তর। | বানৌজা পদ্মা ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। |
| ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ | পরিবারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর। | কোস্ট গার্ড বেইস মোংলা ও শরণখোলা থানা। |
ভারতীয় কোস্ট গার্ডের কাছ থেকে আব্দুল মান্নানকে গ্রহণের পর বঙ্গোপসাগরে দায়িত্বরত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ ‘পদ্মা’-তে তাঁকে তুলে দেওয়া হয়। নৌবাহিনীর জাহাজটি উদ্ধারকৃত জেলেকে কোস্ট গার্ড আউটপোস্ট ‘দুবলা’-তে হস্তান্তর করে। এরপর গত বৃহস্পতিবার বিকেলে কোস্ট গার্ডের নিজস্ব বোটে করে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তাঁকে কোস্ট গার্ড বেইস মোংলায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাঁর প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র সম্পন্ন করা হয়।
দীর্ঘ ১০ দিন নিখোঁজ থাকার পর আব্দুল মান্নানকে ফিরে পেয়ে তাঁর পরিবারে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। মোংলা বেইস থেকে তাঁকে শরণখোলা থানা পুলিশের মাধ্যমে মহেশখালীর তাঁর নিজ গ্রামে পাঠানো হয়। উদ্ধারকৃত জেলের পিতা কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “আমরা আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু আল্লাহর রহমতে ও সরকারের সহযোগিতায় আমার ছেলে ফিরে এসেছে।”
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক জানান, সমুদ্রসীমায় নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় আধুনিক নেভিগেশনাল সরঞ্জাম না থাকার কারণে জেলেরা আন্তর্জাতিক জলসীমা অতিক্রম করে ফেলে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদের সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড সবসময়ই সমুদ্রের জানমাল রক্ষায় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মাধ্যমে বিপদে পড়া মানুষের সেবায় নিয়োজিত রয়েছে।
আব্দুল মান্নানের উদ্ধার ও সফলভাবে প্রত্যাবর্তন দুই প্রতিবেশী দেশের কোস্ট গার্ডের পারস্পরিক পেশাদারিত্ব ও মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ। গভীর সমুদ্রে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে যখন জীবন বিপন্ন হয়, তখন নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের এমন সুসমন্বিত উদ্ধার অভিযানই সমুদ্রগামী মানুষের একমাত্র ভরসার জায়গা হয়ে দাঁড়ায়।