খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬
স্মরণে
কথাসাহিত্যিক শওকত আলী
বাংলা কথাসাহিত্যে যাঁরা ইতিহাস, রাজনীতি ও প্রান্তিক মানুষের জীবনযন্ত্রণাকে গভীর মানবিকতায় তুলে ধরেছেন—শওকত আলী তাঁদের অন্যতম। তাঁর কলমে সমাজের অন্তঃসলিলা স্রোত, শোষণ–বঞ্চনার বাস্তবতা ও মানুষের নীরব প্রতিরোধ এক অনন্য শিল্পরূপ পেয়েছে।
১৯৩৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জে তাঁর জন্ম। কলেজজীবনেই কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হন তিনি; অচিরেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এই রাজনৈতিক চেতনা ও সংগ্রামের অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে দৃঢ় সামাজিক বোধ ও ইতিহাস-সচেতন দৃষ্টি।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাবন্দি করে—যা তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কর্মজীবনে সাংবাদিকতা দিয়ে শুরু করলেও পরে শিক্ষকতায় যোগ দেন। বামপন্থীদের ‘নতুন সাহিত্য’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখির পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত, মাসিক সমকাল ও ইত্তেফাক-এ তাঁর গল্প, কবিতা ও শিশুতোষ রচনা প্রকাশিত হয়েছে।
শওকত আলীর কথাসাহিত্যের এক অনবদ্য সৃষ্টি ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’—যেখানে নিম্নবর্গের মানুষের বঞ্চনা, শোষকের করাল গ্রাসের বিপরীতে অচ্ছুৎ সম্প্রদায়ের বিপ্লব-বিদ্রোহ স্পষ্ট ও শক্তিশালীভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর ‘ওয়ারিশ’ উপন্যাসে ব্রিটিশ শাসন, দেশভাগ ও হিন্দু–মুসলিম দাঙ্গার মর্মন্তুদ বাস্তবতা গভীর শিল্পবোধে চিত্রিত।
তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে—পিঙ্গল আকাশ, অপেক্ষা, গন্তব্যে অতঃপর, উত্তরের খেপ, অবশেষে প্রপাত, জননী ও জাতিকা, জোড় বিজোড়, উন্মুল বাসনা, লেলিহান সাধ, শুন হে লখিন্দর, বাবা আপনে যান প্রভৃতি।
এছাড়া ‘দক্ষিণায়নের দিন’, ‘কুলায় কালস্রোতে’ ও ‘পূর্বরাত্রি পূর্বদিন’—এই উপন্যাসত্রয়ীর জন্য তিনি লাভ করেন ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার।
কথাসাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯০ সালে তাঁকে একুশে পদক প্রদান করা হয়। পাশাপাশি তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার ও অজিত গুহ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু সম্মানে ভূষিত হন।
২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি শওকত আলীর জীবনাবসান ঘটে। তবে তাঁর সাহিত্য—প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর, ইতিহাসের সাক্ষ্য এবং মানবিক দায়বদ্ধতার প্রতীক হয়ে—চিরকাল পাঠকের সঙ্গে বেঁচে থাকবে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।