খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্প্রতি ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে, যা প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ দানকারী সংস্থাগুলোকে একটি সুসংগঠিত ব্যাংকিং কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসার পথ প্রশস্ত করেছে। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে দেশে ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক’ নামক একটি নতুন ধারার আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম হতে যাচ্ছে, যা মূলত নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রবর্তিত ‘সামাজিক ব্যবসা’ মডেলের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে।
এই অধ্যাদেশের প্রধান উদ্দেশ্য হলো নিম্নআয়ের মানুষ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় এনে তাদের স্বাবলম্বী করা। এতদিন অধিকাংশ ক্ষুদ্রঋণ দাতা সংস্থা (MFI) বাণিজ্যিক ব্যাংকিং কাঠামোর বাইরে থেকে দাতা সংস্থা বা পাইকারি ঋণের ওপর নির্ভর করে চলত। এখন থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকগুলো সাধারণ আমানতকারীদের কাছ থেকেও তহবিল সংগ্রহ করতে পারবে এবং সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে।
নিচে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
সারণি: ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশের প্রধান শর্ত ও কাঠামো
| বিষয়বস্তু | বিবরণ ও শর্তাবলি |
| অনুমোদিত মূলধন | ৫০০ কোটি টাকা (প্রতিটি শেয়ার ১০০ টাকা মূল্যের) |
| পরিশোধিত মূলধন | সর্বনিম্ন ২০০ কোটি টাকা |
| মালিকানা বণ্টন | ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ন্যূনতম ৬০% অংশ সংরক্ষিত |
| পরিচালনা পর্ষদ | ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ মোট ১০ সদস্যের পর্ষদ |
| তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা | সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক (বর্তমানে এমআরএ-এর পাশাপাশি) |
| ব্যবসায়িক মডেল | সামাজিক ব্যবসা (বিনিয়োগকারী কেবল মূলধন ফেরত পাবেন, লভ্যাংশ নয়) |
এই অধ্যাদেশের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো ‘সামাজিক ব্যবসা’র ধারণা। এখানে বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগকৃত মূলধন ফেরত পেলেও ব্যবসার মুনাফা লভ্যাংশ হিসেবে নিতে পারবেন না। অর্জিত মুনাফার একটি অংশ রিজার্ভ ফান্ডে জমা রাখা হবে এবং অবশিষ্ট অংশ পুনরায় সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হবে। এটি মূলত একটি নিঃস্বার্থ ব্যবসায়িক কাঠামো, যেখানে মূল লক্ষ্য মুনাফা অর্জন নয় বরং সামাজিক সমস্যার সমাধান। অধ্যাদেশে ক্ষুদ্র উদ্যোগের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে বলা হয়েছে, ২৫ জনের কম কর্মী এবং ১.৫ কোটি টাকার কম সম্পদসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানই এর আওতাভুক্ত হবে।
ক্ষুদ্রঋণ খাতে কিস্তি আদায়ে জবরদস্তির যে অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়, নতুন অধ্যাদেশে তার কঠোর সমাধান দেওয়া হয়েছে। ঋণ খেলাপিদের ক্ষেত্রে যেকোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার অন্তত ১৫ দিন আগে নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া, ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (ADR) ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ঋণ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার হয়রানি, জবরদস্তি বা মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণকারী আচরণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যদি কোনো ব্যাংক আইন বহির্ভূতভাবে বলপ্রয়োগ করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে।
ব্যাংক পরিচালনার জন্য গঠিত ১০ সদস্যের পর্ষদে বৈচিত্র্য রাখা হয়েছে। চারজন পরিচালক নির্বাচিত হবেন ঋণগ্রহীতাদের মধ্য থেকে, তিনজন অন্যান্য শেয়ারহোল্ডারদের মধ্য থেকে এবং দুইজন স্বতন্ত্র পরিচালক মনোনীত করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যবস্থাপনা পরিচালক পর্ষদে থাকলেও তার কোনো ভোটাধিকার থাকবে না। এই কাঠামোর ফলে ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর তদারকি নিশ্চিত হবে এবং ক্ষুদ্রঋণ খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
তবে এই নতুন আইনের ফলে ছোটখাটো এনজিও-ভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলো কিছুটা উদ্বেগে রয়েছে। উচ্চ মূলধন এবং কঠোর কমপ্লায়েন্স মেনে চলা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর ফলে ভবিষ্যতে অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান একীভূত (Merge) হয়ে বড় শক্তিশালী ব্যাংকে রূপান্তরিত হতে পারে।