খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে পণ্য খালাস করে কর্ণফুলী নদীতে দিনের পর দিন পণ্য আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে নেমেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। আজ বৃহস্পতিবার কর্ণফুলী নদীর সদরঘাট এলাকায় পরিচালিত এক বিশেষ অভিযানে লাইটার জাহাজগুলোতে পণ্য খালাসের দীর্ঘসূত্রতার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। আমদানিকারকরা সময়মতো পণ্য খালাস না করায় জাহাজগুলো মাসের পর মাস নদীতে ভাসছে, যা আসন্ন রমজানের আগে বাজারে অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাদিয়া আফরিনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে ‘দিশারী-৬’ নামক পাইলট জাহাজে চড়ে বিভিন্ন লাইটার জাহাজের নথিপত্র যাচাই করা হয়। অভিযানের সময় ‘এমভি আল আসওয়াদ-২’ নামক একটি জাহাজে তল্লাশি চালিয়ে দেখা যায়, জাহাজটি দীর্ঘ ৩৪ দিন ধরে ১ হাজার ৯০০ টন গম নিয়ে বন্দরে অলস বসে আছে। জাহাজের মাস্টার নজরুল ইসলাম জানান, গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর সাগরে বড় জাহাজ থেকে এই গম সংগ্রহ করা হলেও আমদানিকারকের পক্ষ থেকে খালাসের কোনো সংকেত পাওয়া যায়নি।
একই চিত্র দেখা গেছে ‘এমভি আল-ওয়াহাব’ নামক আরেকটি জাহাজে। ২ হাজার ৪০০ টন গম নিয়ে জাহাজটি গত ৩১ ডিসেম্বর থেকে নদীতে ভাসছে। আমদানিকারকদের এই উদাসীনতা ও রহস্যময় অবস্থানের কারণে জাহাজগুলো কার্যত ভাসমান গুদামে পরিণত হয়েছে।
নিচে আজকের অভিযানের উল্লেখযোগ্য তথ্য ও জরিমানার বিবরণ তুলে ধরা হলো:
সারণি: কর্ণফুলী নদীতে পরিচালিত অভিযানের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
| জাহাজের নাম | পণ্যের ধরণ ও পরিমাণ | অবস্থানের সময় | গৃহীত ব্যবস্থা/জরিমানা |
| এমভি আল আসওয়াদ-২ | ১,৯০০ টন গম | ৩৪ দিন | সতর্কবার্তা ও আইনগত পদক্ষেপ |
| এমভি আল-ওয়াহাব | ২,৪০০ টন গম | ৩০ দিন | ২০,০০০ টাকা (১৫ জানুয়ারি) ও সতর্কতা |
| অন্যান্য ৭টি জাহাজ | বিবিধ ভোগ্যপণ্য | বিভিন্ন মেয়াদ | ২,০০,০০০ টাকা (সম্মিলিত) |
| সর্বমোট অভিযান | ৯টি লাইটার জাহাজ | – | ২,২০,০০০ টাকা জরিমানা |
বন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী, বড় জাহাজ থেকে পণ্য লাইটারিং করার পর সর্বোচ্চ তিন দিনের মধ্যে তা খালাস করার বিধান রয়েছে। কিন্তু অভিযানে দেখা গেছে, আমদানিকারকরা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে পণ্য বন্দরে আটকে রাখছেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাদিয়া আফরিন সাংবাদিকদের বলেন, “দিনের পর দিন লাইটার জাহাজে পণ্য রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। যারা আইন অমান্য করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
চট্টগ্রাম বন্দরের উপপরিচালক (নিরাপত্তা) লে. কমান্ডার সৈয়দ সাজ্জাদুর রহমান জানান, আসন্ন পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে কিছু অসাধু চক্র বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এই কৌশলী মজুতদারি করছে। পণ্যবাহী এসব লাইটার জাহাজ যাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খালাস হয়, তা নিশ্চিত করতে বন্দরের এই সাঁড়াশি অভিযান নিয়মিত বিরতিতে অব্যাহত থাকবে।
লাইটার জাহাজ দীর্ঘসময় আটকে থাকায় একদিকে বন্দরে জাহাজ জট তৈরি হয়, অন্যদিকে নৌ-চ্যানেলের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ব্যাহত হয়। এছাড়া আমদানিকারকদের এই বিলম্বে খালাসের ফলে অতিরিক্ত ‘ডেমারেজ’ বা ক্ষতিপূরণ দিতে হয়, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়ে খুচরা বাজারে পণ্যের দামের ওপর। সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় এবং বন্দর এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আজকের অভিযানে মোট ৯টি জাহাজকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের অবিলম্বে পণ্য খালাসের জন্য চূড়ান্ত সতর্কবার্তা প্রদান করেছে।