খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত জটিলতা নিরসনে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন কলকাতা হাইকোর্ট। প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে, আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে সীমান্তের ৯টি জেলায় অধিগ্রহণকৃত সমস্ত জমি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে তুলে দিতে হবে। আদালতের এই নির্দেশকে জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আদালত তাদের পর্যবেক্ষণে জাতীয় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতির কারণে জমি হস্তান্তরে বিলম্ব হতে পারে বলে যে যুক্তি উত্থাপন করা হয়েছিল, তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, প্রশাসনিক বা নির্বাচনী ব্যস্ততা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থকে বাধাগ্রস্ত করার অজুহাত হতে পারে না। তবে রাজ্য সরকার চাইলে এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চতর আদালতে আবেদন করার পথ খোলা রাখা হয়েছে।
নিচে মামলার মূল বিষয়বস্তু ও পরিসংখ্যানের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:
সারণি: পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ সীমান্ত ও বেড়া নির্মাণ সংক্রান্ত তথ্যাবলি
| বিষয়ের বিবরণ | পরিসংখ্যান ও তথ্যাদি |
| পশ্চিমবঙ্গের মোট সীমান্ত দৈর্ঘ্য | প্রায় ২,২১৬ কিলোমিটার |
| বর্তমানে বেড়াবিহীন অংশ | মোট সীমান্তের প্রায় ২৬ শতাংশ |
| জমি হস্তান্তরের চূড়ান্ত সময়সীমা | ৩১ মার্চ, ২০২৬ |
| অধিগ্রহণযোগ্য জমির লক্ষ্যমাত্রা | ২৩৫ কিলোমিটার |
| বিএসএফ-এর হাতে থাকা জমির পরিমাণ | ৭১ কিলোমিটার (পূর্ববর্তী তথ্য অনুযায়ী) |
| মামলাকারী | লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) সুব্রত সাহা |
সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুব্রত সাহার দায়ের করা একটি জনস্বার্থ মামলার (PIL) প্রেক্ষিতে এই রায় আসে। পিটিশনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের একটি বড় অংশে বেড়া না থাকায় অনুপ্রেবেশ, গবাদি পশু পাচার, স্বর্ণ চোরাচালান এবং জাল নোটের কারবার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয় অর্থ অনেক আগেই রাজ্য সরকারকে প্রদান করা হলেও জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে ছিল।
আদালত জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটিকে তিনটি স্তরে বিন্যস্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন:
১. সরাসরি হস্তান্তর: যেসব জমির অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ প্রদান সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলো ৩১ মার্চের মধ্যে হস্তান্তর করতে হবে।
২. প্রক্রিয়াধীন জমি: যেসব জমির অধিগ্রহণ বর্তমানে চলমান, তা দ্রুত শেষ করে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।
৩. বিশেষ আইন প্রয়োগ: জাতীয় প্রয়োজনে প্রয়োজনে সরাসরি জমি দখলের জন্য বিশেষ আইন ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।
কলকাতা হাইকোর্টের এই নির্দেশ আসার পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিরোধী দল বিজেপি এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে এটিকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জয়’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত হলে পাচার ও অনুপ্রবেশ বন্ধ হবে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস জানিয়েছে যে, তারা সীমান্ত সুরক্ষার বিরোধী নয়, তবে সাধারণ কৃষকদের জমির ন্যায্য পাওনা এবং যথাযথ পুনর্বাসনের বিষয়টিকে নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
আগামী এপ্রিল মাসে এই মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন রাজ্য সরকারকে একটি বিস্তারিত হলফনামা জমা দিয়ে জানাতে হবে যে ৩১ মার্চের মধ্যে কতটুকু জমি বিএসএফ-কে বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এই রায়ের ফলে দীর্ঘ কয়েক দশকের ঝুলে থাকা সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এক নতুন গতি পেতে যাচ্ছে।