খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬
গাজীপুরের বোর্ডবাজারে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করা ছেলেটি একসময় দর্শকের হৃদয় ছুঁয়েছিল পর্দায়। সেই ছেলে এখন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পীর মর্যাদা পেয়েছেন। ‘আম-কাঁঠালের ছুটি’ সিনেমায় মইন্না চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ২০২৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাচ্ছেন মোঃ লিয়ন। এর আগে তিনি মেরিল–প্রথম আলো সমালোচক পুরস্কারও অর্জন করেছিলেন।
ময়মনসিংহের চরপাড়ার ছেলে লিয়নের জীবনযাত্রা যেন নিজেই এক বাস্তবধর্মী সিনেমা। শৈশবের প্রথম বছরেই পরিবারের ভার কাঁধে এসে পড়ে। অভাবের সংসার সামলাতে একসময় তিনি গাজীপুরে আসেন। পোশাক কারখানায় কাজের চেষ্টা ব্যর্থ হয় জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকার কারণে। এরপর বোর্ডবাজারেই থিতু হন।
লিয়ন রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ শুরু করেন বাবা আবদুল খলিলের সঙ্গে। রোদ-বৃষ্টি আর ঘামের সঙ্গে প্রতিদিন ইট-সিমেন্ট নিয়ে লড়াই করা, তিন-চার তলায় সিঁড়ি বেয়ে ওঠা—এটাই তার দৈনন্দিন জীবন। মাসে কাজের দিন থাকে ১০–১৫ দিন, মেসে সহকর্মীদের সঙ্গে থাকে। যা আয় হয়, তার একটি অংশ পরিবারে পাঠান।
তবু এক দশক আগে তিনি অন্য এক আলোয় এসেছিলেন।
| সাল | সিনেমা | চরিত্র | বয়স | উল্লেখযোগ্য ঘটনা |
|---|---|---|---|---|
| ২০১৬ | আম-কাঁঠালের ছুটি | মইন্না | ১৩ | প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো |
| ২০২৩ | আম-কাঁঠালের ছুটি | মইন্না | ২০ | জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন |
২০১৬ সালে নির্মাতা মোহাম্মদ নূরুজ্জামানের সিনেমায় লিয়ন ডানপিটে কিশোর ‘মইন্না’ চরিত্রে অভিনয় করেন। প্রথমবারের জন্য ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো ভয়ের ও অজ্ঞানতার সঙ্গে ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে চরিত্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে পর্দার মইন্না হয়ে ওঠেন। দর্শকের ভালোবাসা পান, কিন্তু বাস্তব জীবনে সিনেমার আলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পড়াশোনা থেমে যায়, ছোট ভাইয়ের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। নৈশবিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির বেশি পড়তে পারেননি।
২০২৪ সালে মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারের মনোনয়ন খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে লিয়নের কোনো খোঁজ নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্মাতার অনুসন্ধান শেষপর্যন্ত তার এক ফুফুর মাধ্যমে সফল হয়।
২০২৪ সালের ২৪ মে ঢাকার ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারে লিয়নের নাম ঘোষণা হয়। শহীদুজ্জামান সেলিম ও নাসির উদ্দিন খানের মতো প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের পেছনে ফেলে শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পীর পুরস্কার ওঠে তার হাতে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে উপস্থাপক হানিফ সংকেত বলেন, “অনেকেই পুরস্কারের পেছনে ছোটে, আবার কেউ আছে যাঁদের পুরস্কারই খুঁজে বেড়ায়। লিয়ন আহমেদ তাদের একজন।”
পুরস্কার হাতে পাওয়া লিয়ন বোর্ডবাজারে ফিরে এসেছে, তবে এবার চোখে নতুন স্বপ্ন। পড়াশোনা করতে চান এবং জীবনের কঠিন অধ্যায় পেরিয়ে নতুন করে শুরু করার সাহস পেয়েছেন। মইন্না চরিত্র হয়তো পর্দার, কিন্তু লিয়নের জীবন বাস্তবের এক শক্তিশালী সিনেমা-সংগ্রাম, হারানো আর ফিরে আসার গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।