খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় শুল্ক চুক্তি করতে যাচ্ছে। এই চুক্তি সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে সই হওয়ার কথা। তবে খসড়া ও শর্তাবলি এখনো প্রকাশ করা হয়নি, যা দেশের ব্যবসায়ী ও বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
সরকারি সূত্র জানাচ্ছে, চুক্তি স্বাক্ষরের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ একটি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) সই করেছে। ফলে চুক্তির বিস্তারিত বিষয়, শুল্ক সুবিধা, শর্তাবলি বা সম্ভাব্য প্রভাব এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
রপ্তানি খাতের নেতারা আশা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তি রপ্তানি ক্ষেত্রে সুবিধা আনতে পারে। তবে এর বিনিময়ে বাংলাদেশকে কোন ধরনের শর্ত মানতে হবে এবং তা শিল্প, বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ বাজারে কী প্রভাব ফেলবে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, “এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে কারা লাভবান হবেন এবং কারা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন তা না জেনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।” তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানিপণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৫ শতাংশে নামার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, “চুক্তির খসড়া সম্পর্কে কিছু জানা না থাকায় মন্তব্য করা কঠিন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়াই যুক্তিযুক্ত হতো।”
বিশ্লেষকদের মন্তব্য
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “চুক্তিটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হচ্ছে না। নির্বাচনের পরে হলে রাজনৈতিক দলগুলো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে পারত। যে নির্বাচিত সরকার আসছে, তার হাতে চুক্তির প্রভাব কতটা পড়বে, তা ভাবার বিষয়।”
চুক্তির সম্ভাব্য বিষয়বস্তু
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে:
| বিষয় | সম্ভাব্য বিবরণ |
|---|---|
| শুল্ক ও অশুল্ক বাধা | কিছু পণ্যের আমদানি-রপ্তানিতে শুল্ক সুবিধা বা বাধা |
| ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি | তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল পণ্য সম্পর্কিত শর্তাবলি |
| উৎস বিধি | কোন দেশে উৎপাদিত পণ্যকে কী শর্তে আমদানি করা হবে |
| জাতীয় নিরাপত্তা | বাণিজ্য ও নিরাপত্তার সংমিশ্রণ বিষয়ক শর্ত |
| কৃষি ও এলএনজি আমদানি | দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে আমদানি সুবিধা |
| বিমান ও যন্ত্রাংশ | আমদানির শর্ত ও প্রক্রিয়া নির্ধারণ |
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার, বিপরীতে আমদানি প্রায় ২০০ কোটি ডলারের। এ ব্যবধান কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য বাংলাদেশি বাজার আরও উন্মুক্ত করার শর্ত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যান্য বড় সিদ্ধান্ত
গত বছরের নভেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার চট্টগ্রামের পতেঙ্গার লালদিয়ায় নতুন কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালের সঙ্গে ৩৩ বছরের চুক্তি করেছে। একই দিনে বুড়িগঙ্গার পানগাঁও নৌ টার্মিনাল ২২ বছরের জন্য সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। এছাড়া ডিপিওয়ার্ল্ডের হাতে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের ঠিক আগে এমন চুক্তি করা স্বাভাবিকভাবে প্রশ্নের উদ্রেক করে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চুক্তি সইয়ের সময় সামান্য পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করা যেত, তড়িঘড়ি চুক্তি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।