খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শবেবরাত মুসলিম উম্মাহর কাছে এক তাৎপর্যপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ রাত। শাবান মাসের মধ্যরাতে আল্লাহ তাআলার রহমত, মাগফিরাত ও নৈকট্য লাভের বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি হয়। এই মহিমান্বিত রাতে যে সব আমল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে করতে উৎসাহ দিয়েছেন, তার মধ্যে কবর জিয়ারত একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কবর জিয়ারত মূলত মৃত্যুর বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং দুনিয়ার মোহ কাটিয়ে আখিরাতমুখী জীবন গঠনে সহায়তা করে। ইসলামে কবর জিয়ারত কোনো নির্দিষ্ট দিনের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়; যেকোনো দিনই তা করা যায়। তবে শবেবরাতে এই আমলের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়, কারণ নবীজি (সা.) নিজে এ রাতে জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে কবরবাসীদের জন্য দোয়া করতেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “তোমরা কবর জিয়ারত করো। কারণ কবর জিয়ারত দুনিয়ার প্রতি আসক্তি কমিয়ে দেয় এবং আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।” এই হাদিস স্পষ্ট করে যে, কবর জিয়ারত কেবল মৃতদের জন্য নয়, বরং জীবিতদের আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংশোধনেরও একটি কার্যকর মাধ্যম।
হজরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনায় জানা যায়, শবেবরাতের এক রাতে তিনি নবীজিকে ঘরে না পেয়ে জান্নাতুল বাকিতে খুঁজে পান। সেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) কবরবাসীদের জন্য দোয়া করছিলেন এবং এ রাতের বিশেষ ফজিলতের কথা উল্লেখ করেন—যে রাতে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। এ বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, শবেবরাতে কবর জিয়ারতের একটি শক্তিশালী সুন্নতি ভিত্তি রয়েছে।
আমাদের সমাজে অনেক সময় কবর জিয়ারত নিয়ে বাড়াবাড়ি বা ভুল পদ্ধতির প্রচলন দেখা যায়। অথচ ইসলামে কবর জিয়ারতের নিয়ম অত্যন্ত সহজ ও সংযত। কবরস্থানে প্রবেশের পর সর্বপ্রথম কবরবাসীদের সালাম দেওয়া সুন্নত। এরপর দরুদ শরিফ, কুরআনের কিছু আয়াত বা ছোট সূরা পড়ে মৃতদের জন্য ইসালে সওয়াব করা যায়। পাশাপাশি তাদের মাগফিরাত ও মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা উচিত।
দোয়ার সময় বিশেষ একটি শিষ্টাচার অনুসরণ করা প্রয়োজন। কবরকে সামনে রেখে বা কবরের দিকে মুখ করে হাত তুলে দোয়া করা অনুচিত। বরং কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বা কবরকে পেছনে রেখে কিবলামুখী হয়ে দোয়া করাই উত্তম। চাইলে মনে মনে দোয়া করলেও তা কবুলের জন্য যথেষ্ট।
নিচের ছকে কবর জিয়ারতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল ও সংশ্লিষ্ট দিক সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| আমলের ধরণ | সংক্ষিপ্ত বিবরণ | উদ্দেশ্য |
|---|---|---|
| সালাম প্রদান | কবরস্থানে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে কবরবাসীদের সালাম দেওয়া | মৃতদের সম্মান ও সুন্নত পালন |
| কুরআন তিলাওয়াত | ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, ইখলাসসহ সহজ সূরা পাঠ | ইসালে সওয়াব |
| দরুদ শরিফ | নবীজি (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ | দোয়ার কবুলিয়ত বৃদ্ধি |
| দোয়া | মৃতদের মাগফিরাত ও নিজের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা | আখিরাতের কল্যাণ |
কবর জিয়ারতের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) যে দোয়াগুলো পাঠ করতেন, সেগুলো পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। যেমন—“আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবূর…” এবং “আসসালামু আলাইকুম দারা ক্বাওমিম মুমিনিন…”—এই দোয়াগুলোর মাধ্যমে কবরবাসীদের প্রতি শান্তির বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয় এবং নিজেরাও মৃত্যুর পর তাদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার বাস্তবতা স্মরণ করি।
সুতরাং শবেবরাতে কবর জিয়ারত কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কাজ নয়; এটি হৃদয় জাগ্রত করার, গুনাহ থেকে ফিরে আসার এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মূল্যবান সুযোগ। নবীজি (সা.)-এর সুন্নত অনুসরণ করে বিনয়, সংযম ও খালেস নিয়তে এই আমল আদায় করলে ইনশাআল্লাহ মৃত ও জীবিত—উভয়েই এর কল্যাণ লাভ করবে।