খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের পর ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসার সম্ভাবনার কথা যখন যুক্তরাষ্ট্র ইঙ্গিত দিচ্ছে, ঠিক সেই সময়ই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে ইরানের একটি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে ধাওয়া দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে ঘটনাটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থানরত মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ইরানের একটি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করা হয়। সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ এবং জাহাজে থাকা নাবিকদের জীবন রক্ষাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। মার্কিন যুদ্ধবিমানটি সরাসরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন থেকে উড্ডয়ন করে ড্রোনটিকে লক্ষ্য করে।
সেন্টকম আরও দাবি করে, ভূপাতিত হওয়া ড্রোনটি ছিল শাহেদ-১৩৯ মডেলের, যা ইরানের দক্ষিণ উপকূল থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থানরত মার্কিন রণতরীর দিকে দ্রুত ও ‘আগ্রাসীভাবে’ এগিয়ে আসছিল। ড্রোনটির প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট কোনো তথ্য পায়নি, তবে উত্তেজনা কমানোর বিভিন্ন সংকেত ও সতর্কতা উপেক্ষা করেই সেটি জাহাজের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল বলে জানানো হয়।
এই ঘটনার পরপরই ইরানি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি। তবে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি ইরানি ড্রোনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ড্রোনটি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য সফলভাবে পাঠাতে সক্ষম হয়েছিল। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে বলেও জানানো হয়।
ড্রোন ইস্যুর পাশাপাশি আরও একটি ঘটনায় উত্তেজনা বাড়ে। সেন্টকমের অভিযোগ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ এম/ভি স্টেনা ইম্পেরেটিভকে ধাওয়া করে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী। এতে আইআরজিসির দুটি দ্রুতগামী নৌকা ও একটি মোহাজের ড্রোন অংশ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানি বাহিনী ট্যাংকারটিতে উঠে সেটি দখলের হুমকি দেয়, যা আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক।
অন্যদিকে ইরানের ফার্স সংবাদ সংস্থা ইরানি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, জাহাজটি প্রয়োজনীয় আইনগত অনুমতি ছাড়া ইরানের আঞ্চলিক জলসীমায় প্রবেশ করেছিল। সতর্ক করার পর জাহাজটি এলাকা ত্যাগ করে বলে তাদের দাবি। ফলে এই ঘটনাকে তারা নিজেদের সার্বভৌম অধিকার রক্ষার অংশ হিসেবেই দেখছে।
নিচের টেবিলে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মূল দিকগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য | ইরানের বক্তব্য |
|---|---|---|
| ড্রোন ভূপাতিত | আত্মরক্ষা ও জাহাজের নিরাপত্তার জন্য গুলি করা হয়েছে | ড্রোনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, তদন্ত চলছে |
| ড্রোনের অবস্থান | আন্তর্জাতিক জলসীমা | আন্তর্জাতিক জলসীমা |
| জাহাজ ধাওয়া | ইরানি নৌকা ও ড্রোন দখলের হুমকি দিয়েছে | জাহাজটি অনুমতি ছাড়া আঞ্চলিক জলসীমায় ঢুকেছিল |
| কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট | আলোচনার ইঙ্গিতের মধ্যেই উত্তেজনা | সার্বভৌম অধিকার রক্ষার দাবি |
বিশ্লেষকদের মতে, এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শুধু সামরিক উত্তেজনাই নয়, বরং সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সামান্য একটি ঘটনার প্রভাব যে কত দ্রুত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রতিফলিত হতে পারে, এই ঘটনাগুলো তারই স্পষ্ট উদাহরণ।