স্থানীয় সুতা ব্যবহার করে উৎপাদিত তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নগদ সহায়তার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এ খাতে ১ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হলেও, নতুন করে আরও সাড়ে ৩ শতাংশ যোগ হলে মোট সহায়তার পরিমাণ দাঁড়াবে ৫ শতাংশে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের সাম্প্রতিক বৈঠকে এ বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সম্মতি মিলেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় সুতার ব্যবহার বাড়বে, একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা স্পিনিং মিলগুলোও কিছুটা স্বস্তি পাবে।
গত মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থ সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান, বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ এবং তৈরি পোশাক খাতের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে স্থানীয় ও বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি, রপ্তানি প্রবণতা, উৎপাদন ব্যয় এবং এলডিসি উত্তরণের পর প্রণোদনার সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
নগদ সহায়তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিস্থিতি বিশ্লেষণের জন্য ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটিতে অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বস্ত্র ও পোশাক খাতের প্রধান সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা রয়েছেন। আগামী ১০ কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে সুপারিশ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুপারিশের ভিত্তিতেই বাড়তি নগদ সহায়তার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।
একই দিনে অর্থ সচিবের সঙ্গে বিজিএমইএর নেতাদের পৃথক বৈঠকে বকেয়া নগদ সহায়তার আড়াই হাজার কোটি টাকা ছাড়ের সিদ্ধান্ত হয়। বর্তমানে পোশাক খাতে মোট বকেয়া নগদ সহায়তার পরিমাণ প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। অর্থ সচিব জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই আড়াই হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হবে, যা শিল্পের চলমান তারল্য সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর প্রত্যক্ষ নগদ সহায়তা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। হাতে থাকা মাত্র সাত মাস সময়ের মধ্যেই এ সুবিধা কার্যকর করা গেলে রপ্তানি হ্রাস ও স্থানীয় সুতাকলগুলোর অবিক্রীত সুতার সংকট কিছুটা হলেও কমবে। শেষ পর্যন্ত সাড়ে ৩ শতাংশ বাড়তি সহায়তার বিষয়ে একধরনের ঐকমত্য হলেও, সুতা আমদানিতে ডি-বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের প্রশ্নে মতবিরোধ থেকেই গেছে।
বিটিএমএর পরিচালক খোরশেদ আলমের মতে, নতুন প্রণোদনা সাময়িক স্বস্তি দিলেও অবৈধ সুতা আমদানি বন্ধ না হলে সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। তাঁর অভিযোগ, কাস্টমসের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে জাল সনদ ও মিথ্যা ঘোষণায় প্রতিবেশী দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ সুতা ঢুকছে, যা স্থানীয় মিলগুলোর বাজার নষ্ট করছে।
অন্যদিকে, বস্ত্র ও পোশাক খাতের সংগঠনগুলোর মধ্যে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের জন্য বাণিজ্য সচিবকে দায়ী করে বিজিএমইএ তাঁর পদত্যাগ দাবি করার ঘোষণা দিয়েছে। সংগঠনটির সহসভাপতি শিহাব উদ্দোজা চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, একতরফা আলোচনার কারণেই সুতা আমদানি ও ডি-বন্ড ইস্যুতে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, নির্বাচন ও ঈদ উপলক্ষে উৎপাদন বন্ধসহ একাধিক সংকটে পড়েছে পোশাক খাত। এসব কারণে উদ্যোক্তারা স্বল্প সুদে ঋণ ও দ্রুত প্রণোদনা ছাড়ের ওপর জোর দিচ্ছেন।
নগদ সহায়তার সম্ভাব্য চিত্র
| বিষয় |
বর্তমান অবস্থা |
প্রস্তাবিত অবস্থা |
| নগদ সহায়তার হার |
১.৫ শতাংশ |
৫ শতাংশ |
| বাড়তি সহায়তার পরিমাণ |
— |
৩.৫ শতাংশ |
| মোট বকেয়া সহায়তা |
৬,০০০ কোটি টাকা |
আংশিক ছাড় প্রক্রিয়াধীন |
| কমিটির সুপারিশের সময়সীমা |
— |
১০ কর্মদিবস |
সব মিলিয়ে, বাড়তি নগদ সহায়তার সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় সুতা ও তৈরি পোশাক—উভয় খাতই স্বল্পমেয়াদে হলেও নতুন করে গতি পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।