খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রাচীন বিশ্বের স্থাপত্যশৈলী বললেই আমাদের চোখের সামনে সবার আগে ভেসে ওঠে মিসরের পিরামিড। তবে বিস্ময়কর হলেও সত্য, আমাদের প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কার মাটিতেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এমন এক স্থাপত্য, যা একসময় উচ্চতার দিক থেকে পিরামিডের পরেই নিজের স্থান করে নিয়েছিল। শ্রীলঙ্কার ঐতিহাসিক শহর অনুরাধাপুরায় অবস্থিত এই কালজয়ী কীর্তির নাম ‘জেতাভানারামায়া’ (Jetavanaramaya)। ১,৭০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও কালের আবর্তে টিকে থাকা এই বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভটি আজও মানব সভ্যতার এক অনন্য নিদর্শণ।
জেতাভানারামায়ার মহিমা বুঝতে হলে আগে অনুরাধাপুরা শহর সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। ‘সিন্ধুর টিপ’ খ্যাত শ্রীলঙ্কার এই প্রথম রাজধানীটি সারা বিশ্বের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। ইতিহাস অনুযায়ী, ভারতের বাইরে অনুরাধাপুরার বাসিন্দারাই সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এই শহরটি কেবল রাজনৈতিক কেন্দ্রই ছিল না, বরং এটি ছিল জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক চর্চার প্রাণকেন্দ্র।
৩০১ খ্রিষ্টাব্দে রাজা মহাসেনার শাসনামলে যখন জেতাভানারামায়ার নির্মাণকাজ শেষ হয়, তখন এটি ছিল বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ স্থাপনা। এর উচ্চতা ছিল প্রায় ৪০০ ফুট। সে সময় প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে ছিল যথাক্রমে মিসরের গিজার খুফু ও খাফ্রে পিরামিড। তবে কালের পরিক্রমায় এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে এর উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ২৩৩ ফুটে।
এই স্মৃতিস্তম্ভটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এটি সম্পূর্ণ ইটের তৈরি। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ইটের স্থাপনা। নিচে জেতাভানারামায়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ও ঐতিহাসিক তথ্য তুলে ধরা হলো:
| সূচক (Metric) | সংশ্লিষ্ট তথ্য ও বিবরণ |
| নির্মাণকাল | ৩০১ খ্রিষ্টাব্দ (রাজা মহাসেনার আমল) |
| ব্যবহৃত ইট | আনুমানিক ৯ কোটি ৩৩ লাখ পোড়ামাটির ইট |
| বর্তমান উচ্চতা | ২৩৩ ফুট (প্রাথমিক উচ্চতা ছিল ৪০০ ফুট) |
| ভিত্তির গভীরতা | প্রায় ২৮ ফুট (পাথরের স্তরের ওপর স্থাপিত) |
| নির্মাণ সামগ্রী | পোড়ামাটির ইট ও বিশেষ জৈব আঠালো প্রলেপ |
| মূল স্থাপত্য শৈলী | গম্বুজাকৃতি স্তূপ (Stupa) |
জেতাভানারামায়া নির্মাণে যে পরিমাণ ইট ব্যবহৃত হয়েছে, তার সংখ্যা শুনলে আধুনিক যুগের প্রকৌশলীরাও বিস্মিত হন। বলা হয়, এই স্মৃতিস্তম্ভের ইটগুলো দিয়ে যদি ৩ ফুট উচ্চতার একটি দীর্ঘ দেয়াল তৈরি করা হয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহর থেকে পিটসবার্গ (প্রায় ৬০০ কিলোমিটার) পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। পাথরের তৈরি পিরামিডের তুলনায় ইটের স্থাপনা টিকে থাকা অনেক বেশি কঠিন, কারণ ইট সময়ের সাথে সাথে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। শ্রীলঙ্কার কেলানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অনূঢ়া মানাতুঙ্গা বলেন, কোটি কোটি ইট নির্ভুলভাবে তৈরি ও স্থাপন করার কারিগরি দক্ষতা সে যুগে সত্যিই অকল্পনীয় ছিল।
জেতাভানারামায়া কেবল একটি নিঃসঙ্গ স্তম্ভ ছিল না; একে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল ‘জেতাভানা বিহার’ নামক এক বিশাল মঠ। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, এই বিহারে প্রায় ২০০ জন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বসবাস করতেন। মঠের ঘরগুলোর নকশা এমনভাবে করা হয়েছিল যেন সন্ন্যাসীরা ঘর থেকে বের হওয়া মাত্রই তাদের চোখে সুউচ্চ স্মৃতিস্তম্ভটি পড়ে, যা তাদের নিরন্তর আধ্যাত্মিক প্রেরণা জোগাত।
রাজা মহাসেনা এই স্তম্ভটি নির্মাণের জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি যুদ্ধবন্দীদেরও কাজে লাগিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, শ্রীলঙ্কার ঐতিহ্যবাহী নির্মাণশৈলী অনুসরণ করে বিপুল পরিমাণ পাথর ও ইট বহনে হাতি এবং বলদে টানা গাড়ি ব্যবহার করা হয়েছিল।
জেতাভানারামায়ার পর শ্রীলঙ্কায় বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য কোথাও আর এত বিশাল গম্বুজাকৃতি স্তূপ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। এটি আজও প্রমাণ করে যে, প্রাচীন লঙ্কান প্রকৌশলীরা ভূতত্ত্ব এবং স্থাপত্যবিদ্যায় কতটা পারদর্শী ছিলেন। আজ হয়তো গিজার পিরামিডের মতো এটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত নয়, কিন্তু এর গাম্ভীর্য এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অধ্যায় হিসেবে অম্লান থাকবে।