খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে বর্তমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বা ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর প্রতি জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। গত শুক্রবার উত্তর ক্যারোলাইনার ফোর্ট ব্র্যাগ সামরিক ঘাঁটিতে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প সরাসরি বলেন, ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিরসনে সরকার পরিবর্তনই হবে “সবচেয়ে ভালো উপায়”।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে ইরানের বর্তমান ধর্মীয় নেতৃত্ব ও আয়তুল্লাহ খামেনির শাসনের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে প্রকাশ্য এবং কঠোর অবস্থান হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে যখন ওমানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে পর্দার অন্তরালে কূটনৈতিক আলোচনার খবর পাওয়া যাচ্ছিল, তখন ট্রাম্পের এমন যুদ্ধংদেহী মনোভাব নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।
ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ (Maximum Pressure) প্রয়োগের অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বর্তমানে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান নিচে তুলে ধরা হলো:
| রণতরির নাম | বর্তমান অবস্থান / গন্তব্য | সক্ষমতা ও উদ্দেশ্য |
| ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড | মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রারত | বিশ্বের বৃহত্তম ও অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ; বিমান হামলা ও নজরদারিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। |
| ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন | মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল | দীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চলে কৌশলগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। |
ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “আমরা যদি কোনো সম্মানজনক চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারি, তবে আমাদের এই বিশাল সামরিক শক্তিরই প্রয়োজন পড়বে।” উল্লেখ্য, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় ক্যারিবীয় সাগরে মোতায়েন ছিল।
ইরানের বর্তমান অস্থিতিশীলতার মূলে রয়েছে চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের সাম্প্রতিক মন্তব্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন পরিকল্পিতভাবে ইরানে ডলারের সংকট তৈরি করেছিল। এর ফলে গত বছরের ডিসেম্বরে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের রেকর্ড দরপতন ঘটে, যা সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে। গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার কঠোর অবস্থান নিলে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
নির্বাসিত সাবেক শাহপুত্র রেজা পাহলভি মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে মানবিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্প এই বিক্ষোভকারীদের সহায়তার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, ওয়াশিংটন এই পরিবর্তনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। যদিও খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তিনি কাকে দেখতে চান, সে বিষয়ে রহস্য বজায় রেখেছেন।
রয়টার্সের তথ্যমতে, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে কয়েক সপ্তাহব্যাপী বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে রেখেছে। ট্রাম্পের সবুজ সংকেত পেলেই এই হামলা শুরু হতে পারে। সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এই সংঘাত শুরু হলে তা হবে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবে সম্প্রতি ওমানের মাসকাটে দুই দেশের প্রতিনিধিরা পারমাণবিক ইস্যুতে বৈঠক করেছেন। পশ্চিমা বিশ্বের সন্দেহ ইরান গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে, যা তেহরান বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই কঠোর অবস্থান ও সামরিক প্রস্তুতি সেই আলোচনার টেবিলকে কার্যত অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটনের কৌশল এখন স্পষ্ট—হয় ইরানকে মাথা নত করে চুক্তিতে আসতে হবে, নতুবা সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্বকে মেনে নিতে হবে।