খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণা এবং জনমতের প্রতিফলনে বড় ধরনের বৈষম্য নিয়ে নতুন এক আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম শহীদ মীর মুগ্ধের ভাই ও নবীন বিএনপি নেতা মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধের শেয়ার করা একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে এই বিতর্কের সৃষ্টি। ওই পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে, অনলাইনে বিএনপির অফিশিয়াল মিডিয়া সেলের চেয়ে জামায়াতে ইসলামীর তথাকথিত ‘বট অ্যাকাউন্ট’ বা স্বয়ংক্রিয় আইডিগুলো অনেক বেশি সক্রিয় ও শক্তিশালী। বুধবার (২১ জানুয়ারি, ২০২৬) মধ্যরাতে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডি থেকে আতিক ইউ এ খানের একটি পর্যবেক্ষণ শেয়ার করার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে এটি ‘টক অব দ্য টাউনে’ পরিণত হয়েছে।
আতিক ইউ এ খানের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের গঠনমূলক পোস্টগুলোতে বিপুল পরিমাণে নেতিবাচক রিয়্যাক্ট (হাহা) প্রদান করা হচ্ছে। বিশেষ করে তারেক রহমানের জনপ্রিয় কর্মসূচিগুলোতে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। আতিকের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, তারেক রহমানের ‘ফ্যামিলি কার্ড ক্যাম্পেইন’ সংক্রান্ত একটি খবরে ১ লাখ ৩০ হাজার রিয়্যাক্টের মধ্যে ৭০ শতাংশই ছিল নেতিবাচক। অন্যদিকে, কড়াইল বস্তিবাসীদের ফ্ল্যাট দেওয়ার ঘোষণার খবরেও ৬৫ শতাংশ ‘হাহা’ রিয়্যাক্ট লক্ষ্য করা গেছে।
সোশ্যাল মিডিয়া রিয়্যাক্ট ও জামায়াত প্রার্থীর বিতর্ক এক নজরে:
| পর্যালোচনার বিষয় | বিস্তারিত পরিসংখ্যান ও তথ্য |
| তারেক রহমানের ফ্যামিলি কার্ড | ১ লাখ ৩০ হাজার রিয়্যাক্ট; যার ৭০% ছিল ‘হাহা’। |
| কড়াইল বস্তিবাসী ফ্ল্যাট ঘোষণা | ৪০ হাজার রিয়্যাক্টের মধ্যে ৬৫% ছিল ‘হাহা’। |
| ঢাকা-১৭ জামায়াত প্রার্থী বিতর্ক | ডা. খালিদুজ্জামানের ইনফার্টিলিটি ডিগ্রিকে ভুয়া দাবি (যা আতিকের মতে সঠিক)। |
| জামায়াত প্রার্থীর ডিগ্রির উৎস | ভারতের একটি প্রতিষ্ঠান (বাংলাদেশে অননুমোদিত হতে পারে)। |
| অনলাইন বনাম অফলাইন জনমত | অনলাইনে বিএনপি পিছিয়ে থাকলেও গ্রামীণ জনপদে জনপ্রিয়তায় শীর্ষ। |
এই বিতর্কের মধ্যেই ঢাকা-১৭ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ডা. এস এম খালিদুজ্জামানের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপির একটি অংশ। আতিক ইউ এ খান বিষয়টি বিশ্লেষণ করে জানান, ডা. খালিদুজ্জামানের ডিগ্রিটি মূলত ভারতের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত এবং এটি সম্পূর্ণ বৈধ। তবে বিদেশি ডিগ্রি হওয়ার কারণে বাংলাদেশে সেটি বিএমডিসি কর্তৃক নিবন্ধিত বা অনুমোদিত না-ও হতে পারে। আতিকের মতে, বিএনপির সমর্থকরা যথাযথ তথ্য না জেনেই এই বিতর্কটি উসকে দিয়েছে, যা ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা যুদ্ধের একটি অংশ।
আতিক ইউ এ খান তাঁর পোস্টে প্রশ্ন তুলেছেন, বিএনপির মিডিয়া সেল কি বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অত্যন্ত দুর্বল, নাকি জামায়াতে ইসলামী লাখ লাখ কৃত্রিম আইডি বা ‘বট’ ব্যবহার করে অনলাইনের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে? তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, ইউটিউব ও ফেসবুকের বিভিন্ন জরিপে বিএনপি পিছিয়ে থাকলেও প্রতিষ্ঠিত জাতীয় দৈনিকগুলোর জনমত জরিপে ধানের শীষ এখনো ৭০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পাচ্ছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, বিএনপির সমর্থকরা মূলত গ্রাম-গঞ্জের বাস্তব রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও ডিজিটাল মাধ্যমে তাঁরা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছেন বা কম সক্রিয়।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাবেক সিইও এবং বর্তমানে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধের এই পোস্ট শেয়ার করাকে দলের অভ্যন্তরীণ আত্মসমালোচনা হিসেবে দেখছেন অনেকে। স্নিগ্ধের মতে, আগামীর রাজনীতি কেবল মাঠের লড়াই নয়, বরং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ। তিনি মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ধরে রাখতে হলে অনলাইনে অপপ্রচার রোধে বিএনপিকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী হতে হবে।
সোশ্যাল মিডিয়ার ‘হাহা’ রিয়্যাক্ট বা ‘বট আইডি’ দিয়ে একটি দলের প্রকৃত জনপ্রিয়তা যাচাই করা অসম্ভব হলেও এটি জনমতের ওপর একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলে। বিএনপির মতো একটি প্রাচীন দলের অনলাইন প্রচারণার দৈন্যদশা এবং জামায়াতের সুসংগঠিত বট বাহিনীর প্রভাব এখন স্পষ্ট। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি যদি দ্রুত তাদের মিডিয়া সেল পুনর্গঠন না করে, তবে তরুণ প্রজন্মের কাছে তারা তথ্যগত লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়তে পারে।