খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২৫
বিস্তারিত: এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ার লিমিটেডের বিদেশি ঋণের ২৮৩ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই পরিশোধ করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই পদক্ষেপ ঋণচুক্তির শর্তের লঙ্ঘন। বিষয়টি নিয়ে রূপালী ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এস আলম গ্রুপ ও চীনের সেপকো থ্রি-এর যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম মাসুদ এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক উল্লেখ করেছে যে, রূপালী ব্যাংক তৃতীয় কিস্তির ১৪০ মিলিয়ন ডলার (১৯ ডিসেম্বর ২০২৪ এ পরিশোধিত) এবং চতুর্থ কিস্তির ১৪৩ মিলিয়ন ডলার (২৩ জুন ২০২৫ এ পরিশোধিত) ব্যাংক অব চায়নার সিঙ্গাপুর শাখায় পাঠিয়েছে, যার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এর আগে প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তি বাবদ মোট ২৪৩.৭৬ মিলিয়ন ডলার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনে পরিশোধ করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রথম কিস্তিটি চুক্তি অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিশোধিত হয় এবং দ্বিতীয় কিস্তিটি ২০ জুন ২০২৪ তারিখে অনুমতিক্রমে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণ ও ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যাংক অব চায়না থেকে ১,৬৯৭ মিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে এ পর্যন্ত সুদ ও আসল মিলিয়ে ৫৭৫ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং এসএস পাওয়ারের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২০১৬ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যৌথভাবে এই প্রকল্পটির উদ্বোধন করেছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, পঞ্চম কিস্তি পরিশোধের জন্য রূপালী ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে এবং আবেদন জমা দিলে তা অনুমোদন করা হবে। অন্যদিকে, রূপালী ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তির অর্থ সঠিক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে, তবে প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নেওয়া সম্ভব হয়নি, এটি রূপালী ব্যাংকের ইচ্ছাকৃত কোনো ভুল ছিল না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠি পাওয়ার পর তারা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন এবং পঞ্চম কিস্তি পাঠানোর আগে অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নেবেন।
তার মতে, তহবিল স্থানান্তর সাধারণত একাধিক ধাপের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যার মধ্যে একটি ফরেন কারেন্সি (এফসি) অ্যাকাউন্ট থাকে যেখানে তহবিল জমা করা যায় কিন্তু তোলা যায় না। ফলে এফসি অ্যাকাউন্ট এড়িয়ে সরাসরি লেনদেনটি সম্পন্ন করা হয়। রূপালী ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এসএস পাওয়ার পেমেন্টের জন্য সমস্ত ডলার কেনায় অর্থায়ন করেছে এবং এখন পর্যন্ত প্রতিটি কিস্তি কোম্পানিটির পক্ষ থেকেই এসেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।
রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, তিনি এই বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারবেন না এবং এটি ব্যাখ্যা করার অবস্থানে তিনি নেই। তিনি স্থানীয় কার্যালয় থেকে ব্যাখ্যা নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে রূপালী ব্যাংকের যোগাযোগ বিভাগ গণমাধ্যমকে একটি লিখিত বিবৃতি প্রদান করে।
ব্যাংকটির বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) অনুমোদিত ঋণের কিস্তি বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ব অনুমোদন ছাড়াই পরিশোধ করা যেতে পারে। এসএস পাওয়ার ১ লিমিটেডের ক্ষেত্রে ব্যাংক অব চায়না, রূপালী ব্যাংক পিএলসি, অন্য ছয়টি চীনা ঋণদাতা ব্যাংক এবং এসএস পাওয়ার ১ লিমিটেডের মধ্যে স্বাক্ষরিত অ্যাকাউন্টস এগ্রিমেন্টের অধীনে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে মোট ১০টি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল। এর মধ্যে দুটি নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্ট—ডেবট সার্ভিস রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট (ডিএসআরএ) এবং ডেবট সার্ভিস অ্যাক্রুয়াল অ্যাকাউন্ট (ডিএসএএ)—প্রকল্পের ঋণ পরিশোধে স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য নির্ধারিত ছিল।
ডিএসআরএ-এর মূল উদ্দেশ্য হলো ঋণের এক পূর্ণ কিস্তির সমপরিমাণ রিজার্ভ রাখা, যা ঋণের পুরো মেয়াদে অক্ষত রাখতে হবে। অন্যদিকে, ডিএসএএ মাসিক ভিত্তিতে তহবিল জমা করার জন্য ব্যবহার করা হয় যাতে অর্ধবার্ষিক কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করা যায়। নির্ধারিত তারিখে ঋণদাতার ডিএসএএ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিস্তির পরিমাণ কেটে নেয়। তহবিলে ঘাটতি থাকলে ডিএসআরএ থেকে কিস্তি কেটে নেওয়া হয়।
প্রথম কিস্তির সময় এসএস পাওয়ার লিমিটেডকে প্রথমে ডিএসআরএ ব্যালেন্স তৈরি করতে হতো। কিন্তু বিপিডিবি বিদ্যুতের দাম পরিশোধ না করায় কোম্পানিটি ডিএসএএ ব্যালেন্স তৈরি করতে পারেনি। ফলে ঋণদাতারা ডিএসআরএ থেকে অর্থ কেটে নেয়। পরবর্তীতে ডিএসআরএ-এর ব্যালেন্স পূরণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে ডলার পাঠানো হয়। দ্বিতীয় কিস্তির জন্য ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে ১০১ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয় এবং এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল। তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তির ক্ষেত্রে অফশোর ব্যাংকিং সুবিধা না থাকায় রূপালী ব্যাংক সরাসরি এফসি অ্যাকাউন্ট ডেবিট করতে পারেনি। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকায় বিডার অনুমোদন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশিকা মেনে ব্যাংকটি সরাসরি ডিএসএএ-তে কিস্তি জমা দিয়েছে।
খবরওয়ালা/এএসএন