অলাত এহ্সান
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ মার্চ ২০২৫
নীতিগল্প ১
ছড়ির রূপান্তর
লোহার দণ্ডকে ছড়ি বানিয়ে পাহাড় ডিঙিয়ে এক লোক পাশের উপত্যকার নিরপদ্রুব গ্রামগুলোয় যেতেন ‘সৎকথা’ পৌঁছে দিতে। তিনি কথা বললেন ছড়ার ছন্দে আর কবিতার ভাব নিয়ে, উপত্যকাবাসীর হৃদয়গ্রাহী ভাষায়। যেমন দুর্গম দূরের পথ পেরোতে ছড়িটা তার বেশ সহায়ক হয়েছিল। পাহাড়ি খাঁড়িপথে কিছু গাছগাছড়া পড়ত। তিনি একবার ছড়িটা পাথরে পিটিয়ে-ঘষে একপাশ ধারালো করে তুললেন। তাতে পথের আগাছা কেটে চলতে সহায় হলো। উপত্যকার মানুষের সহায়ক কিছু কাজও করে দিতেন তা দিয়ে, শেখালেন ছড়ি থেকে ধারালো দণ্ড তৈরির কৌশল। তখন তিনি সদ্গুণের সঙ্গে বৈশ্বিক কিছু কাজের কথাও নিয়ে এলেন বয়ানে। ছড়িটার তো তখনো আরেক পাশ মসৃণ ছিল। একদিন লোকটা মসৃণ পাশটাও ধারালো করে তুললেন। তাতে ছড়িটাই আর যে থাকল না, নিজস্ব প্রতিকৃতি গেল হারিয়ে। তাতে ভর দিয়ে আর চলার অবস্থাও রইল না, উল্টো তা হাতে উঠে এল। লোকটার বৈশ্বিক সমৃদ্ধিও আসতে শুরু করেছিল এপাশ-ওপাশ থেকে। এবার তিনি ফের আশপাশের উপত্যকায় যেতে চাইলেন ‘সৎকথা’ ছড়িয়ে দিতে। কিন্তু খাঁড়িপথে ছড়িটা বেশ জরুরি ছিল। লোকটা ছড়ি-রূপান্তরিত দুধারী দণ্ডে ভর দিয়েই পাহাড় ডিঙোতে চাইলেন। কিন্তু লোকটা খেয়ালই করেননি, বহুদিন হাতে তুলে ব্যবহারে ছড়ি ধরার হাতলটা আর ভর নেওয়ার অবস্থায় নেই। তাই খাঁড়িপথে মাটিতে দণ্ডটা গেঁথে গিয়ে হাতল খুলে পড়ল, তাতে দণ্ড ধরে দাঁড়িয়ে থাকার অবস্থাও রইল না। দণ্ডটা আঁকড়ে থাকতে গিয়ে হাত দুটোও ততক্ষণে ফালা ফালা। তীব্র আর্তচিৎকারে শীর্ষ থেকে গড়িয়ে পড়লেন লোকটা। শব্দ শুনে পাশের উপত্যকার লোকেরা এসে দেখল, ‘সৎকথা’ প্রচারের লোকটা পাহাড়ের আরেক পাশে খাড়ির তলানিতে পড়ে আছেন। তার হাত দুটোও নিজের রক্ত মেখে বিবর্ণ হয়ে আছে। এখন তার ছেঁড়াখোঁড়া শরীর, আর বিক্ষত হাত ধরে তোলাও সহজ হবে না। নড়বড়ে শরীরে তারও আর সম্ভব হবে না ওই পথে মাড়ানো। তারপর দীর্ঘদিন তাকে আশপাশের উপত্যকায় দেখা গেল না। প্রায় নিজের উপত্যকায় আটক পড়লেন তিনি। ব্যথাতুর চোখে গিরিখাতের কিনারে শুয়েই শীর্ষে চেয়ে থাকতেন, যেন দৈব সংকেতের অপেক্ষা। শেষে একদিন বাইরে বেশ শব্দ শুনে ঘাড় তুলে চোখ মেললেন পুরোনো পথের দিকে। তিনি দেখলেন, পাহাড় ডিঙিয়ে পাশের উপত্যকার লোকজন ছিন্নভিন্ন পোশাকে তার দিকে ছুটে আসছে, প্রায় উদ্ভ্রান্তের মতো। কাছে আসতেই তারা বেশ রূঢ়ভাবে উত্তর দিলেন— ওপারের লোকজনও ছড়ির দুধার ধারালো করতে শিখে গেছে। আর তাদের মধ্যে ছড়া ‘সৎকথা’ মতভেদ তৈরি হয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেগে পড়েছে। কেউ কারও কথা শুনছে না, কাউকে মানছেও না। সব শুনে সলিল চোখে লোকটা গূঢ় হাসলেন।
নীতিগল্প ২
দাঁতের বিবেচনা
বনের ধারে ছোট্ট কুটিরে বসে এক সকালে গুরু আর শিষ্যের মধ্যে কথা হচ্ছিল। শিষ্য জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, আদিতে সিংহ আর ছাগল উভয়ই বন্য ছিল, আজ তারা কত দূরের! তারপর সিংহ কেন মাংসাশী হলো, আর ছাগল কেন ঘাস খায়? গুরু শান্তভাবে জবাব দিলেন, প্রাণী দুটোর চোয়ালের দিকে লক্ষ করো। সিংহের চোয়ালের দুপাশে মাংসাশী দাঁত আছে, আর ছাগলের দাঁতগুলো সমান। শিষ্য আবার জিজ্ঞেস করল, তারপরও আমরা সিংহের দাঁত সচরাচর দেখি না, কিন্তু সারাক্ষণই ছাগলের দাঁত দেখি! গুরু বললেন, সিংহের বড় মাংসাশী দাঁত থাকলেও তা ঢেকে রাখার মতো পুরু ঠোঁট আছে, আর অত বড় শরীর থাকলেও প্রাণীটা সারাক্ষণ শিকার তাড়িয়ে বেড়ায় না। কিন্তু ছাগল যতক্ষণ খাবার পায়, ততক্ষণই খেতে থাকে। এমনকি যখন খাবার না থাকে, তখনো সে চোয়াল নাড়াতে থাকে। শিষ্য দমে গেল না। তারপর সে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, ছাগলের যদি মাংসাশী দাঁত গজায়, আর সিংহ যদি হারায়, তাহলে কী হবে? গুরু খানিকক্ষণ চুপ রইলেন। শিষ্যের কৌতূহল বুঝতে চেষ্টা করলেন। তারপর আশ্বস্ত করার মতো বললেন, শঙ্কিত হইয়ো না বাছা, ছাগলের কখনোই মাংসাশী দাঁত গজাবে না; কারণ, তা ধারণ করার মতো শক্ত চোয়াল নেই, ওপরে-নিচে দাঁতের তেমন ভাঁজও নেই। তবু তুমি যদি তার চোয়ালে দুটো মাংসাশী দাঁত পুঁতে দাও, তার মুখটা এত ছুঁচোলো যে ঠোঁটের আড়ে, দাঁতের ভাঁজে লুকানো জন্য জায়গা হবে না। ফলে, সারাক্ষণ তাকে হাঁ মুখে বের করে থাকতে হবে, তার গর্জন নেই, তাই ভ্যা ভ্যা করে কানের কুহর ফাটিয়ে ছাড়বে। মাংসাশী দাঁত ব্যবহারের চোয়াল নেই, তাই সারাক্ষণ দাঁত ঘষে ক্ষয় করার চেষ্টা করতে হবে। আর সিংহ!— শিষ্য ফের জিজ্ঞেস করল। সে নিশ্চয় বিব্রত থাকবে— গুরু বললেন। তিনি খানিকটা অস্বস্তি বোধ করলেন। শেষে তিনি বললেন, শোনো বাছা, যার মাংসাশী দাঁত নেই, তার জিব বেশি ভয়ংকর, চলেও বেশি। সেটা ছাগল যেমন, কমবুদ্ধির মানুষও তেমনি।