খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬
ইউরোপীয় ফুটবলের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছেন জার্মান কোচ মারি লুইস ইটা। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে তিনি জার্মান বুন্দেসলিগার ক্লাব ইউনিয়ন বার্লিনের অন্তবর্তীকালীন প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে নজির গড়েছেন। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচটি লিগে এই প্রথম কোনো নারী পুরুষদের পেশাদার দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব পেলেন। তবে এই অসাধারণ অর্জনের পরপরই তাকে পড়তে হয়েছে লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ আক্রমণের মুখে—যা আধুনিক ক্রীড়াজগতের জন্য এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।
গত রবিবার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইটাকে লক্ষ্য করে নানা বিদ্রূপাত্মক, অবমাননাকর এবং লিঙ্গভিত্তিক মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। এই আচরণকে ‘লজ্জাজনক’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ইউনিয়ন বার্লিনের ডিরেক্টর অব ফুটবল হর্স্ট হেল্ট। তিনি বলেন, “বর্তমান যুগেও আমাদের এমন মানসিকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। মারি লুইস একজন দক্ষ, পরিশ্রমী ও দূরদর্শী কোচ। তার যোগ্যতা নিয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই।”
মারি লুইস ইটার এই পদে আসা কোনো প্রতীকী সিদ্ধান্ত নয়, বরং তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের ফল। একজন সাবেক পেশাদার ফুটবলার হিসেবে তিনি জার্মান ক্লাব টারবাইন পটসডামের হয়ে নারী চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয় করেছেন। মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি কোচিং ক্যারিয়ারেও তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন ধারাবাহিকভাবে।
ইউনিয়ন বার্লিনের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কোচ হিসেবে তার অধীনে দল উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। তরুণ খেলোয়াড়দের উন্নয়ন, কৌশলগত দক্ষতা এবং দল পরিচালনায় তার সক্ষমতা ক্লাব কর্তৃপক্ষের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ইটা এর আগেও ইতিহাস গড়েছেন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে তিনি বুন্দেসলিগার প্রথম নারী সহকারী কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আলোচনায় আসেন। সেই অভিজ্ঞতা তাকে পুরুষ দলের ড্রেসিংরুম, ম্যাচ কৌশল এবং উচ্চচাপের পরিবেশ সম্পর্কে গভীর ধারণা দেয়, যা বর্তমান দায়িত্ব পালনে তাকে সহায়তা করছে।
ইউনিয়ন বার্লিন বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। ১৮ দলের বুন্দেসলিগায় তারা ১১তম স্থানে অবস্থান করলেও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স উদ্বেগজনক। শেষ ১৪ ম্যাচে মাত্র দুটি জয় দলটির আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
নিচের টেবিলে দলের সাম্প্রতিক অবস্থার একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:
| সূচক | পরিসংখ্যান |
|---|---|
| লিগে অবস্থান | ১১তম |
| মোট দল | ১৮টি |
| শেষ ১৪ ম্যাচে জয় | ২টি |
| সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স | দুর্বল |
এই পরিস্থিতিতে ক্লাব কর্তৃপক্ষ ইটার ওপর আস্থা রেখে তাকে অন্তবর্তীকালীন প্রধান কোচের দায়িত্ব দিয়েছে। হর্স্ট হেল্টের মতে, ইটা ক্লাবের অভ্যন্তরীণ কাঠামো, খেলোয়াড়দের মানসিকতা এবং দলগত পরিবেশ সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত, যা তাকে দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিতে সহায়তা করবে।
ইটার অভিজ্ঞতা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, নারী কোচদের জন্য পথ এখনও সহজ নয়। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেবল লিঙ্গের কারণে সমালোচনা ও অবজ্ঞার শিকার হতে হচ্ছে তাদের। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের আচরণ কেবল ব্যক্তিকে নয়, বরং পুরো ক্রীড়া ব্যবস্থার উন্নয়নকেই বাধাগ্রস্ত করে।
বর্তমান সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে নারী অংশগ্রহণ ও সমতার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন এমন ঘটনা সমাজের একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা তুলে ধরে।
মারি লুইস ইটার সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে দলকে সাফল্যের পথে ফেরানো, অন্যদিকে সামাজিক বাধা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান দৃঢ় রাখা। তার এই যাত্রা শুধু একটি ক্লাবের নয়, বরং নারী কোচদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, ইটার এই নিয়োগ যেমন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, তেমনি ক্রীড়াজগতে লিঙ্গসমতার প্রশ্নটিকেও নতুন করে সামনে এনেছে। তার সাফল্য ভবিষ্যতে আরও নারী কোচের জন্য পথ উন্মুক্ত করবে—এমন প্রত্যাশাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।