আন্তর্জাতিক সামরিক অঙ্গনে ইরানের শক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই সাধারণত কুদস ফোর্সের নাম সামনে আসে। কিন্তু বাস্তবে ইরানের সামরিক সক্ষমতা কেবল একটি বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি বহুস্তরভিত্তিক, বিস্তৃত এবং সমন্বিত এক জটিল কাঠামো, যেখানে বিভিন্ন ইউনিট নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালন করে।
কোনো আকস্মিক আক্রমণ—ধরা যাক একটি বন্দর, দ্বীপ বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়—ঘটলে প্রথমেই যে বাহিনী সক্রিয় হবে, তা কুদস ফোর্স নয়। বরং অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত, কিন্তু অত্যন্ত প্রশিক্ষিত স্থানীয় ইউনিটগুলো দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করবে। এই প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, যার বিভিন্ন শাখা দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে।
এই কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো “সাবেরিন” সক্ষমতা। এটি কোনো একক ইউনিট নয়; বরং বিশেষ ধরনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমান্ডোদের একটি শ্রেণি, যারা দ্রুত আক্রমণ, হেলিকপ্টার অবতরণ অভিযান এবং দুর্গম এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনায় দক্ষ। তাদের প্রধান শক্তি হলো বিচ্ছিন্ন অবস্থানে থেকেও সমন্বিতভাবে কাজ করার ক্ষমতা।
ইরানের সামরিক কাঠামোর আরেকটি দিক হলো আঞ্চলিক উপস্থিতি। উত্তর-পশ্চিমে সশস্ত্র গোষ্ঠী মোকাবিলা কিংবা দক্ষিণ-পূর্বে বিদ্রোহ দমন—সব ক্ষেত্রেই এই বিশেষ ইউনিটগুলো সক্রিয় থাকে। ফলে তারা কেবল প্রশিক্ষিতই নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্নও। এ কারণে সংকট মুহূর্তে তাদের প্রতিক্রিয়া দ্রুত এবং কার্যকর হয়।
নিচের সারণিতে ইরানের প্রধান বিশেষ সক্ষমতাসম্পন্ন ইউনিটগুলোর ভূমিকা তুলে ধরা হলো—
| ইউনিট |
সংশ্লিষ্ট বাহিনী |
প্রধান কাজ |
বিশেষ বৈশিষ্ট্য |
| সাবেরিন শ্রেণি |
বিপ্লবী গার্ড স্থলবাহিনী |
দ্রুত আক্রমণ, বিশেষ অভিযান |
দেশজুড়ে বিস্তৃত উপস্থিতি |
| আঞ্চলিক বিশেষ ব্রিগেড |
স্থল কাঠামো |
সীমান্ত নিরাপত্তা |
স্থানীয় পরিবেশে দক্ষ |
| নোহেদ ব্রিগেড |
নিয়মিত সেনাবাহিনী |
বিমানযোগে অভিযান |
দ্রুত মোতায়েন ও গোয়েন্দা দক্ষতা |
| নৌ বিশেষ ইউনিট |
বিপ্লবী গার্ড নৌবাহিনী |
সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ, জাহাজ অভিযান |
উপসাগরীয় এলাকায় কার্যকর |
| বাসিজ বিশেষ ইউনিট |
স্বেচ্ছাসেবী কাঠামো |
সহায়তা ও শক্তিবৃদ্ধি |
জনবল ও স্থানীয় তথ্য সরবরাহ |
নিয়মিত সেনাবাহিনীর ভেতরে থাকা নোহেদ ব্রিগেড ইরানের সামরিক ব্যবস্থায় একটি আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। এটি তুলনামূলকভাবে প্রচলিত বিশেষ বাহিনীর মতো কাজ করে—দ্রুত মোতায়েন, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং সরাসরি হামলায় পারদর্শী। অতীতে বিদেশে তাদের সীমিত উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে প্রয়োজনে ইরান বহির্মুখী অভিযানেও এই বাহিনীকে ব্যবহার করতে পারে।
সামুদ্রিক ক্ষেত্রেও ইরানের বিশেষ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য। বিপ্লবী গার্ডের নৌ ইউনিটগুলো পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তারা উভচর হামলা, জাহাজে ওঠা এবং সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণে দক্ষ। এই সক্ষমতা ইরানকে জলপথে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সহায়তা করে।
এছাড়া বাসিজ বাহিনী, যা সাধারণত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় ব্যবহৃত হয়, সংকটের সময় গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইউনিটগুলো মূল বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে।
সব মিলিয়ে, ইরানের সামরিক শক্তির মূল ভিত্তি হলো এর স্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এখানে স্থানীয় ইউনিটগুলো প্রথম প্রতিক্রিয়া জানায়, এরপর বিশেষ প্রশিক্ষিত কমান্ডোরা যুক্ত হয় এবং প্রয়োজনে আরও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
এই ব্যবস্থার কারণে ইরানের বিশেষ বাহিনীকে সহজে চিহ্নিত করা যায় না। তারা দৃশ্যমান বা একক কোনো প্রতীক নয়; বরং একটি বিস্তৃত, অভিযোজিত এবং সমন্বিত নেটওয়ার্ক—যা প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত রূপ বদলাতে সক্ষম। এই বৈশিষ্ট্যই তাদেরকে একদিকে রহস্যময় করে তুলেছে, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের জন্য জটিল চ্যালেঞ্জে পরিণত করেছে।