মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ
প্রকাশ: শুক্রবার, ৮ আগস্ট ২০২৫
এ কথা আমাদের অনেকেরই অজানা নয় যে, লর্ড চার্লস কর্নওয়ালিস ছিলেন একজন ব্রিটিশ সামরিক অধিনায়ক, যিনি গভর্নর জেনারেল হিসাবে ব্রিটিশ ভারত শাসন করতে এসে ১৭৯৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে এই অঞ্চলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালু করেন। এটি মূলত ভূমি রাজস্ব আদায়ের একটি মাধ্যম। এর মাধ্যমে জমিদারদেরকে জমির মালিক এবং কৃষকদেরকে তাদের প্রজা রূপে রূপায়িত করা হয়। তৎকালীন ভারতের বাংলা, বিহার, এবং উড়িষ্যাতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের ফলে মালিকানা না থাকলেও জমির স্থায়ী মালিক হিসেবে জমিদাররা জমি বন্ধক, বিক্রয়, দান বা উত্তরাধিকার সূত্রে হস্তান্তর করতে পারতেন। এই ব্যবস্থার ফলে সরকার কেবল রাজস্ব আদায়কারী হিসেবে কাজ করতো। জমি ব্যবস্থাপনা, কৃষি উন্নয়ন, প্রজাদের অধিকার রক্ষা এই বিষয়গুলোতে সরকারের কোন ভূমিকা ছিল না। বরঞ্চ এর ফলে জমিদারদের ক্ষমতা ও প্রভাব ভয়ংকরভাবে বৃদ্ধি পায়।
জমিদাররা প্রজাদের উপর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রয়োগ করা শুরু করে। প্রজাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়, বিভিন্ন অবৈধ কর ধার্য, এবং শোষণের মাধ্যমে নিজেদের সম্পদ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করতে থাকে। এ সময় জমিদারদের উদাসীনতা, প্রজাদের শোষণ, এবং ঋণের বোঝা কৃষিক্ষেত্রকে মারাত্মকভাবে স্থবির করে দেয়। ক্রমবর্ধমান শোষণ ও ঋণের বোঝার কারণে প্রজাদের দারিদ্র্য মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়। অনেক কৃষক জমি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এই ব্যবস্থা ঔপনিবেশিক শোষণকে আরও তীব্র করে তোলে। অবৈধ পন্থায় ও শক্তি প্রয়োগের ভয় দেখিয়ে নিজেদের মুনাফাকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার জমিদারদের আধিপত্যকে পাকাপোক্ত করার মাধ্যমে জনগণের সম্পদ, মালিকানা, ক্ষমতা ও অধিকার সম্পূর্ণভাবে লুণ্ঠন করে।
প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা উচিত ব্রিটিশদের তাবেদার বা প্রতিনিধি হিসেবে যেমন জমিদাররা দায়িত্ব পালন করেছে, আবার এই জমিদাররাই নিজেদের ক্ষমতা ও বাহাদুরি পাকাপোক্ত করার অভিলাষে নিজের নিকটাত্মীয় ও পছন্দের কিছু মানুষকে তার নিজস্ব ব্যবস্থাপনা কমিটির মানুষ হিসেবে কাজে লাগাতেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে কাছের ব্যক্তি হিসেবে যিনি গণ্য হতেন তাকে বলা হতো সরকার – যে জমিদারের সবকিছু দেখভাল করতো, আরেকজন থাকতো যাকে বলা হতো নায়েব বা দেওয়ান – যিনি ছিলেন জমিদারের ভূমি রাজস্ব আদায়ের প্রধান কর্মচারী, দেওয়ানের সহকারী হিসেবে থাকতেন আরেকজন যাকে নায়েবে দেওয়ান বলা হতো, আর ছিলেন তহশিলদার – যিনি জমিদারের আরেকজন অধীনস্ত রাজস্ব বা খাজনা আদায়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। জমিদারের ধনসম্পদ, প্রভাব প্রতিপত্তি ও এলাকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় এরা সকলেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো বলে একদিকে তারা যেমন ছিল জমিদারের খুব কাছের মানুষ, অন্যদিকে একই কারণে সাধারণ মানুষের কাছে এরা প্রত্যেকেই ছিলেন একেকটি আতংকের নাম!
বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মরত বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা রয়েছে (যেগুলো এনজিও/আইএনজিও নামে পরিচিত), যে সংস্থাগুলো মূলত তাদের কিছু সাধারণ কর্মীদের রক্তঘামে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সকলের কাছে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই সংস্থাগুলোর মধ্যে যেগুলো আইএনজিও নামে স্বীকৃত, সেখানে তাদের আন্তর্জাতিক দফতর থেকে সর্বোচ্চ ৩-৫ বছরের জন্য দেশীয় প্রতিনিধি বা কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ পেয়ে কেউ কেউ এ সকল প্রতিষ্ঠানে উড়ে এসে জুড়ে বসে যেন সেই লর্ড কর্নওয়ালিসের মত এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালু করেছেন। এদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে দশক পার করে এই সংস্থাগুলোর সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হয়ে বসে আছেন, আবার কেউ কেউ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যেন একক মালিক হয়ে শক্ত আসন গেঁড়ে বসে আছেন। বিদায় নেয়া বা নতুনদের জায়গা দেয়া তো দূরের কথা, বরং এদের অনেকেই তাদের একক স্বেচ্ছাচারী আচরণ ও ক্ষমতার ভয়ংকর দাপট দেখিয়ে যাচ্ছেন একচ্ছত্রভাবে। সংস্থায় কর্মরত স্টাফদের যখন যাকে ইচ্ছা বড় পদে অধিষ্ঠিত করছেন, আবার কেউ যৌক্তিক বা প্রতিবাদী কোন কথা বললে বা সাধারণ স্টাফদের কাছে পরম আস্থাভাজন বা শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে পরিগণিত হলে কোন না কোন কালিমা লেপটে দিয়ে বা সংস্থার পুনর্গঠন (restructuring) এর দোহাই দিয়ে এসব কর্মীদের বিদায় করে দিচ্ছেন। আর এখন যুক্ত হয়েছে তহবিল সংকটের দোহাই!
স্থানীয় ও জাতীয় এনজিওগুলোতে এই অবস্থা আরও ভয়াবহ। সংস্থার প্রধানদের দৌরাত্ম্য অনেকটা শিল্পপতিদের মত। এসব সংস্থাকে তারা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হিসেবে পরিচয় করে দিলেও বাস্তবে তারা এই সংস্থাগুলোকে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। এদের অনেকেই তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজনকে নিজের এই সংস্থাগুলোতে বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত করে রাখেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এই উভয় প্রতিষ্ঠানের এসব কর্তা ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে নিয়োগের নামে আগে থেকে ঠিক করে রাখা ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়ে নিয়োগ নাটকের প্রহসনও করে থাকেন। জমিদার সাহেবের মত একান্ত পরিষদবর্গকে (এনজিও তে তারা Senior Management Team বা SMT নামে পরিচিত) সঙ্গে নিয়ে নিজের ইচ্ছে মতো শাসনব্যবস্থা সংস্থার কর্মীদের ওপর যেন ঠিক ঐ জমিদারী কায়দায় চাপিয়ে দিয়ে থাকেন। নিজেকে সমাজের সুশীল হিসেবে পরিগণিত করা এসকল ব্যক্তিরা নিজেরাই যেখানে গণতান্ত্রিক আচরণের ধার ধারেন না, সহকর্মীদের চাকর-বাকর মনে করে তাদের ওপর মারাত্মক স্বেচ্ছাচারী ও কর্তৃত্ববাদী আচরণ করে থাকেন, তারাই আবার সুশাসন ও জনগণের অধিকারহীনতার কথা বলে বিভিন্ন শাসনামলে সরকারের কঠোর সমালোচনাও করে থাকেন নিজেদের দিকে না তাকিয়ে।
একদিকে তথাকথিত এসব আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কেন্দ্রীয় বা আঞ্চলিক অফিসগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের যেমন এ নিয়ে কোন দায় লক্ষ্য করা যায় না, একইভাবে সরকারেরও এসব প্রতিষ্ঠানের তথাকথিত মালিক বনে যাওয়া কর্তা ব্যক্তিদের ওপর কোন মনিটরিং না থাকায় তারা জমিদারদের মতই জীবনযাপন ও আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। এদের বেশিরভাগ বছরের উল্লেখযোগ্য সময় অফিসের খরচে ব্যস্ত সময় পাড়ি দেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেমিনার, কনফারেন্স বা কর্মশালায় অংশগ্রহণের নামে। অনেকে মজা করে যাকে ‘ডেভেলপমেন্ট ট্যুরিজম’ বলে থাকেন। অনেকসময় এসব সফরে তারা তাদের পরিবারকেও অন্তর্ভুক্ত করেন নির্লজ্জভাবে। অভিযোগ আছে এদের অনেকেই অফিসের জন্য কেনা গাড়িগুলো নিজেদের একান্ত ব্যক্তিগত গাড়ি হিসেবে ফুলটাইম ব্যবহার করেন, অনেকেই সংস্থার নামে কেনা জায়গায় নিজের বসতবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত গড়ে তুলেছেন।
এসব তথাকথিত উন্নয়ন সংস্থার মালিকরা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রতি চাকরির ভয়ভীতি দেখিয়ে যথেচ্ছ খারাপ আচরণও করে থাকেন। জনগণের উন্নয়নের নামে বাস্তবিক অর্থে উন্নয়ন আসলে কাদের কতটা হচ্ছে তা যেন দেখার কেউ নেই! সাময়িক সময়ের জন্য চাকরি করতে এসে এভাবে দীর্ঘকাল তারা কিভাবে একই জায়গায় একই পদে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থা কায়েম করে টিকে থাকেন তা নিয়ে কেউ কখনো প্রশ্ন তোলে না। কারণ তারা সমাজে নিজেদেরকে তথাকথিত সুশীল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের সন্তুষ্টির জন্য নানা কায়দাকানুন অনুসরণ করে থাকেন, এবং সরকারের পক্ষ থেকে যারা নানা সংকট তৈরি করতে পারে তাদেরকে নানা সুযোগ-সুবিধা দেয়া ছাড়াও তাদের ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজন বা শুভাকাঙ্ক্ষীদের চাকুরি বা নানাবিধ সুবিধা নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা প্রদান করার কৌশলের অভিযোগের কথাও শোনা যায়। এদের সকলেরই রয়েছে কোন না কোন বড় জায়গা থেকে বড় রকমের পৃষ্ঠপোষকতা। ফলে তারা সবসময়ই সবকিছু থেকে ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যান। বর্তমানে দাতাগোষ্ঠীর তহবিল সংকটের এই দুঃসময়েও হাজার হাজার এনজিওকর্মীর চাকরি চলে গেলেও তাদের নিজেদের এবং তার বলয়ে থাকা উচ্চপদস্থ ও অন্যান্য কর্মীদের কোন রকম সংকটের মুখোমুখি হতে হয়না। এটা সত্যিকার অর্থেই একটা বিস্ময়কর ব্যাপার বটে!
বাংলার নেতা শেরে বাংলা খ্যাত এ কে ফজলুল হক জমিদারী প্রথা রদে প্রধান ভূমিকা পালন করে ছিলেন। তার পাশে ছিল দেশের নির্যাতিত, নিপীড়িত খেটে খাওয়া কৃষক, দিনমজুর ও সাধারণ জনগণ। কিন্তু বর্তমানে এনজিও সেক্টরে চলমান এই জমিদারি প্রথা রোধে এগিয়ে আসার মত সাহসী ব্যক্তি পাওয়া খুবই কঠিন। কারণ, চিরতরে এই সেক্টরে চাকরি হারানোর পাশাপাশি আরও কত ধরনের বিপদ তার ও তার পরিবারের জন্য এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করতে পারে, তা কারোরই অজানা নয়!
লেখক: মানবাধিকার কর্মী, গবেষক ও পলিসি এডভোকেট
খবরওয়ালা/এন