খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২০ মে ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে একটি আবদ্ধ গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর এলাকার প্রবাসী চার ভাইয়ের মরদেহ অবশেষে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার (১৯ মে, ২০২৬) রাত নয়টার দিকে একটি আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজে করে চার প্রবাসীর মরদেহ রাজধানী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। বিমানবন্দরে পূর্ব থেকেই উপস্থিত থেকে নিহতদের কফিনবন্দী মরদেহগুলো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনের সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী। এরপর বিমানবন্দর থেকে বিশেষ শববাহী গাড়ির মাধ্যমে চার ভাইয়ের মরদেহ সড়কপথে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় অবস্থিত তাঁদের নিজ বাসভবনের উদ্দেশ্যে রওনা করা হয়।
আজ বুধবার (২০ মে, ২০২৬) ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই চার ভাইয়ের মরদেহ রাঙ্গুনিয়ার লালানগর এলাকার গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কফিনবন্দী চার ভাইকে একসাথে ফিরে পেয়ে নিহতের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে এক হৃদয়বিদারক ও গভীর শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিবারের উপার্জনক্ষম চার সন্তানকে একসাথে হারানোর এই মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো লালানগর ইউনিয়ন ও পার্শ্ববর্তী এলাকা জুড়ে নেমে এসেছে শোকের কালো ছায়া। প্রিয়জনদের শেষবারের মতো দেখার জন্য ভোর থেকেই নিহতের বাড়িতে স্থানীয় এলাকাবাসী সহ দূরদূরান্ত থেকে আসা শত শত সাধারণ মানুষের ঢল নামে।
ওমানে চার প্রবাসী ভাইয়ের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু, মরদেহ দেশে প্রত্যাবর্তন এবং জানাজা সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্যসমূহ নিচে একটি ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| প্রবাসীদের মৃত্যু ও মরদেহ সংক্রান্ত সূচকসমূহ | সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট এবং যাচাইকৃত প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য |
| নিহত চার ভাইয়ের নাম ও পরিচয় | শাহিদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও রাশেদুল ইসলাম |
| নিহতদের স্থায়ী দেশীয় ঠিকানা | লালানগর গ্রাম, লালানগর ইউনিয়ন, রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম |
| হত্যাকাণ্ড বা দুর্ঘটনা সংঘটিত হওয়ার স্থান | মুলাদ্দাহ এলাকা, ওমান (মধ্যপ্রাচ্য) |
| ওমান পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন | সচল গাড়িতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস |
| মরদেহ দেশে পৌঁছানোর সুনির্দিষ্ট সময় | মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ; রাত নয়টা (ঢাকা বিমানবন্দর) |
| মরদেহ গ্রহণকারী প্রধান জনপ্রতিনিধি | হুমাম কাদের চৌধুরী (সংসদ সদস্য, চট্টগ্রাম-৭ আসন) |
| পারিবারিক শেষ দাফন প্রক্রিয়া ও কবর | লালানগর গ্রামে চার ভাইয়ের জন্য পাশাপাশি চারটি কবর খনন |
| সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সহায়তা | দাফন ও পরিবহন খরচ বাবদ তাৎক্ষণিক বিশেষ আর্থিক অনুদান |
পারিবারিক ও স্থানীয় প্রবাসী সমিতি সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার রাতে ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় একটি পার্কিং করে রাখা বন্ধ গাড়ির ভেতর থেকে রাঙ্গুনিয়ার লালানগরের এই চার প্রবাসী ভাইয়ের নিথর মরদেহ উদ্ধার করে রয়্যাল ওমান পুলিশ। ওমান পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাড়িটি সচল বা চালু থাকা অবস্থায় এর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের নির্গমন পাইপ বা এগজোস্ট থেকে মারাত্মক বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়েছিল। গাড়িটির জানালা ও দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় চার ভাই ওই বিষাক্ত গ্যাস ক্রমাগত শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে গ্রহণ করেন এবং একপর্যায়ে অক্সিজেনের অভাবে দম বন্ধ হয়ে গাড়ির ভেতরেই তাঁদের মৃত্যু হয়।
নিহত প্রবাসীদের পারিবারিক সূত্র আরও নিশ্চিত করেছে যে, চার ভাইয়ের মধ্যে দুই ভাইয়ের গত ১৫ মে ওমান থেকে স্থায়ী বা সাময়িক ছুটিতে বাংলাদেশে ফিরে আসার কথা চূড়ান্ত ছিল। সেই উপলক্ষে দেশে ফেরার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে চার ভাই একসাথে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করার উদ্দেশ্যে ওমানের বারকা নামক এলাকা থেকে বের হয়েছিলেন। চট্টগ্রাম সমিতি, ওমানের সভাপতি মো. ইয়াসিন চৌধুরী ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে জানান, ওই দিন সন্ধ্যায় চার ভাই ওমানের বারকা এলাকায় অবস্থান করছিলেন এবং সেখান থেকে কেনাকাটা শেষে মুলাদ্দাহ এলাকার দিকে রওনা হন। রাত আটটার পর চার ভাইয়ের মধ্যে একজন বারকা এলাকায় অবস্থানরত তাঁদের এক নিকটাত্মীয়ের কাছে মুঠোফোনে একটি কণ্ঠবার্তা বা ভয়েস মেসেজ পাঠান। অত্যন্ত দুর্বল কণ্ঠে পাঠানো ওই বার্তায় তিনি জানান যে, তাঁরা গাড়ির ভেতরে সবাই চরম অসুস্থ বোধ করছেন এবং গাড়ি থেকে বের হওয়ার মতো শারীরিক শক্তি পাচ্ছেন না। একই সাথে তিনি তাঁদের অবস্থানের সুনির্দিষ্ট মানচিত্র বা লোকেশনও পাঠান। পরবর্তীতে গভীর রাতে মুলাদ্দাহ এলাকায় একটি স্থানে গাড়িটি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সন্দেহবশত দুই প্রবাসী বাংলাদেশি ভেতরে চারজনকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পান এবং তাৎক্ষণিকভাবে ওমান পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে গাড়ির দরজা খুলে চারজনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে।
নিহতদের খালাতো ভাই এমরান হোসেন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, চার ভাইকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করার জন্য গতকাল মঙ্গলবার বিকেলেই লালানগর গ্রামের মাটিতে পাশাপাশি চারটি কবর খনন করা হয়েছে। আজ বুধবার বেলা ১১টার দিকে স্থানীয় লালানগর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে চার ভাইয়ের যৌথ জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী বলেন, “একই পরিবারের চার ভাইয়ের এই ধরনের আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। এই ঘটনায় পুরো রাঙ্গুনিয়ার মানুষ গভীরভাবে শোকাহত। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিয়মানুযায়ী এবং সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এই রেমিট্যান্স যোদ্ধা প্রবাসীদের পরিবারকে মরদেহ পরিবহন ও দাফন কার্য সম্পন্ন করার খরচ বাবদ প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে থাকার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আরও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”