মনিরুজ্জামান
প্রকাশ: সোমবার, ২৮ জুলাই ২০২৫
বাঙালির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো হাতের কাছে মহৎ কোনো মানুষকে দেখলে তাকে চিনতে ভুল করা।
কোনো এক দার্শনিক বলেছিলেন, ‘তুমি নির্ভুল আঁকতে পার না কারণ তুমি নির্ভুল দেখতে পার না।’ আমাদের দেশেও এই পর্যায়ের অনেক লেখক, কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী আছেন যারা মনে করেন যশ, খ্যাতি, প্রতিপত্তি লাভ করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো তারা আহমদ ছফার মতো মহান সব্যসাচীকে নির্ভুলভাবে দেখতে পারেননি। নির্ভুলভাবে না দেখলে কতটুকুই বা আঁকা যায়?
আহমদ ছফার গ্রন্থ পাঠ করে যতটা না সত্য জানতে পারলাম তার চাইতে বেশি বিস্মিত হলাম। কেননা তিনি নির্ভুল দেখেছিলেন বলেই নির্ভুল ছবি আঁকতে পেরেছেন।
‘ওঙ্কার’ উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র হচ্ছে নায়কের বোবা স্ত্রী। যে কি-না সমাজের নানান প্রতিকূলতা ও নিপীড়নের শিকার হয়। তার জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে সমাজের নানা অসংগতি প্রকাশিত হয়েছে এ উপন্যাসে।
১৯৬৯ সালে যখন আয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণমানুষ মিছিলে নামে তখন গল্পের নায়ক মিছিলকে পরিহার করে গোপনে থাকতে চায়। কেননা সে আয়ুব খানের গোশত-রুটিতে উদর পূর্ণ করে। যদি আয়ুব খান ক্ষমতা হারায় তাহলে তার সব সুবিধা নেওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা আবার সেই আয়ুব খানের খপ্পরে পড়েছি কি-না সেই প্রশ্ন আজ অবান্তর নয়।
চারদিকে যখন মিছিলে উত্তাল তখন সেই মিছিলের ঢেউ বোবা বউয়ের গায়ে এসে লাগে। মিছিলের জয়ধ্বনি আর আওয়াজ শুনে কথা বলার আগ্রহ তার তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। নায়কের বোবা স্ত্রী জানালায় দাঁড়িয়ে মিছিলের জয়ধ্বনি শুনে আর ভেতরের তাপ ও চাপে ব্যাকুল হয়ে ‘বাঙলা’ শব্দটি উচ্চারণ করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। তখন তার গলা ফেটে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে তাজা টকটকে লাল রক্ত।
নায়ক তার বউকে অচেতন অবস্থায় দেখে তার মনে প্রশ্ন জাগে। যে প্রশ্নের মাধ্যমে উপন্যাসটি শেষ হয়। প্রশ্নটি হচ্ছে, ‘কোন রক্ত বেশি লাল, শহীদ আসাদের নাকি আমার বোবা বউয়ের?’
উপন্যাসে কিন্তু বোবা বউয়ের মৃত্যু হয়নি। আজকাল আমরাও কি এই বোবা বউয়ের মতো বাকরুদ্ধ অবস্থায় আছি?
যদি হয়ে থাকি তাহলে কবে আমাদের কণ্ঠদিয়ে সেই শব্দ বেরিয়ে আসবে, কেউ কি বলতে পারেন?
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে আহমদ ছফা লিখেছেন ‘অলাতচক্র’ নামক একটি বিখ্যাত উপন্যাস। যুদ্ধে কার কি ভূমিকা ছিল তার একটা বিবরণ সেখানে পাওয়া যায়।
আহমদ ছফার লেখা উপন্যাস ‘পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’ রূপকধর্মী সাহিত্য। হলফ করে বলা যায় ছফাত্তোর বাংলা সাহিত্যে এমন উপন্যাস আর দ্বিতীয়টি কেউ লিখতে পারেনি। ফুল, গাছ এবং পাখিদের বর্ণনায় মূলত তিনি মানব সমাজের অব্যক্ত কথাই বলেছেন।
দৃষ্টিভঙ্গিতে কতটুকু সূক্ষ্মতা থাকলে ‘আলমগীর’-এর মতো এমন শৈল্পিক চরিত্র সৃষ্টি করা যায়? ‘আলমগীর’-এর চরিত্রটি দিয়ে আহমদ ছফা আসলে আমাদের কি বুঝাতে চেয়েছেন?
এনজিওগুলোর কাজ কি? আলমগীরের চরিত্র বিশ্লেষণেই তার উত্তর বেরিয়ে আসবে। আলমগীরকে নতুন জামা-কাপড়, স্যান্ডেল প্রভৃতি দেওয়া হলে সে তার বস্তির ছেলেদের বলে সুযোগ পেলে তাকে ‘ফাকাইবো’। সহজ ভাষায় বলা যায় বিদেশি এনজিওগুলো সুযোগমতো এই দেশটাকে ‘ফাকাইবো’।
উপন্যাসে তিনি লিখছেন, ‘আমি ছাদের ওপর তাকিয়ে দেখি, একটি দাঁড়কাক বসে আছে। আহা, বড় ভাল লাগল। শহরে কখনো দাঁড়কাক দেখেছি মনে পড়ে না। গ্রামের মানুষ শহরে এলে যেমন আড়ষ্ট হয়ে থাকে, কাকটিও তেমনি এক কোণায় জবুথবু হয়ে বসে আছে। আমি তার দিকে রুটির টুকরো ছুঁড়ে দিলাম। শহরের কাকেরা সে টুকরোগুলো তার মুখের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে খেয়ে ফেলল। আমার মনে বড় লাগল। এভাবেই শহরের মানুষেরা গ্রামের মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে থাকে।’
এর পরের কথাটিও আরও শ্রুতিমধুর,
‘সুশীল বলল, সেসব কিছু নয়। আপনি সামনের দিকে চেয়ে দেখুন। দাঁড়কাকেরা পাতিকাকদের কীভাবে মেরে মেরে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তাকিয়ে দেখলাম, আট-দশটা দাঁড়কাক একজোট হয়ে যেখানেই পাতিকাক দেখছে খেদিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার পরদিন থেকে দেখতে থাকলাম দাঁড়কাকেরা দল বেঁধে জঙ্গি বিমানের মতো বেগে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেখানেই পাতিকাক দেখছে হামলা করছে।’
সমাজে পুঁজিপতিরা সর্বদাই শ্রমিক শ্রেণির মানুষদের শোষণ করে থাকে। মূলত শ্রমিকের শ্রমকে ডাকাতি করে তারা পুঁজির মালিক হয়। পুঁজিপতিদের সুন্দর ফাঁদে পা দিয়ে অনেক শ্রমিক নেতারাও অল্পদিনে কোটিপতি হয়ে যায়। মুখোশ পড়ে তারা তখন শ্রম ডাকাতিতে পারদর্শী হয়ে ওঠে। এসকল বৃত্ত গুড়িয়ে দিতে না পারলে সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সম্ভব হবে না।
সমাজ পরিবর্তনের জন্য যে সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের প্রয়োজন তা সমাজের বুদ্ধিজীবীরাই পালন করেন। কিন্তু আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা সর্ব অবস্থায় সরকারের গোলামি করে থাকে। ছফার ‘সাম্প্রতিক বিবেচনা: বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ বইটি পড়লেই বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের অজ্ঞতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক, মনসুর মুসা এই উপন্যাস সম্পর্কে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের উপন্যাস লেখক ও পাঠকেরা ছফার ‘পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’-এর জন্য গর্ববোধ করতে পারেন।’
২০০১ সালের ২৮ জুলাই অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে জানাজা শেষে মিরপুরের বুদ্ধিজীবী গোরস্থানের পাশে তাকে দাফন করা হয়। এই কালজয়ী মনীষীর প্রয়াণ দিবসে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
লেখক, সহ-সম্পাদক, খবরওয়ালা।