খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 5শে আশ্বিন ১৪৩২ | ২০ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
দীর্ঘ ৯ বছর পর কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপি তাদের বহু প্রতীক্ষিত ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনের আয়োজন করেছে, যা শনিবার (২০ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত হবে। এই সম্মেলনকে সফল করার জন্য দলটি ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে এবং এর ফলে কর্মীদের মধ্যে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। দীর্ঘদিন পর সম্মেলন হওয়ায়, তৃণমূল থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যন্ত সকলের মধ্যে নতুন নেতা নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।
এই সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভার্চুয়ালি যুক্ত হবেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন। অনুষ্ঠান শুরু হবে সকাল ১১টায়। বিশেষ অতিথি হিসেবে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আব্দুস সালাম উপস্থিত থাকবেন। প্রধান বক্তা হবেন হাবিব উন নবী খান সোহেল, যিনি বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব। অন্যান্য অতিথিদের মধ্যে রয়েছেন সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, কোষাধ্যক্ষ এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, সহ সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহ মোঃ ওয়ারেছ আলী মামুন এবং আবু ওয়াহাব আকন্দ।
তবে এই সম্মেলনের ব্যানার ও আমন্ত্রণপত্রে কিশোরগঞ্জের প্রভাবশালী নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমানের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাকে অতিথি হিসেবেও আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। গত জুলাই মাসে গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কিত একটি বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে ফজলুর রহমানকে তিন মাসের জন্য তার সকল দলীয় পদ থেকে স্থগিত করা হয়েছিল। এর আগে তিনি বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এবং কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
সম্মেলনে নিজের নাম না থাকায় ফজলুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “কিশোরগঞ্জে আট বছর নেতৃত্ব দিয়েছি। হাজার হাজার নেতাকর্মী সম্মেলনে আসবেন, আর আমি ঢাকায় বসে থাকব? যে দলের জন্য আমি মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি, সেখানে কেউ আমাকে সম্মেলনে আসতে বলতে পারবে না।”
সরেজমিনে দেখা গেছে, সম্মেলনকে কেন্দ্র করে পুরো শহর তোরণ ও ব্যানার-ফেস্টুনে সেজে উঠেছে। পুরাতন স্টেডিয়ামে আয়োজিত এই সম্মেলনে ভোটের মাধ্যমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে। ইতোমধ্যে ৭ সদস্যের নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে। সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। এবার জেলা বিএনপির ২১টি ইউনিটের ২ হাজার ৯০ জন কাউন্সিলর তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। সভাপতি পদে দুজন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক উপায়ে নেতৃত্ব নির্বাচনের এই প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানালেও, জেলার দায়িত্ব কার হাতে যাবে তা নিয়ে কিশোরগঞ্জের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।
শীর্ষ পদগুলোতে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাদের মধ্যে বিগত ১৭ বছর ধরে ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাদের প্রতি তৃণমূলের কর্মীদের সমর্থন বেশি দেখা যাচ্ছে। অনেকে অভিযোগ করেছেন যে দীর্ঘদিন ধরে একই নেতৃত্ব থাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা এসেছে। এ কারণে তারা পুরনো নেতৃত্বের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে নতুন মুখকে সুযোগ দেওয়ার এবং ‘এক নেতার এক পদ’ নীতি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।
সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপি সভাপতি শরীফুল আলম এবং সহ-সভাপতি রুহুল হোসাইন। সাধারণ সম্পাদক পদে বর্তমান জেলা সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপি সভাপতি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল, নিকলী উপজেলা বিএনপি সদস্য সাজ্জাদুল হক সাজ্জাদ এবং শফিকুল ইসলাম রাজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিএনপি কর্মী এম এ হাসান বাবুল বলেন, “যারা প্রার্থী হয়েছেন তারা সকলেই যোগ্য। তবে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এক নেতার এক পদ থাকা উচিত। আমরা এই নীতি বাস্তবায়ন চাই, যাতে দল আরও সমৃদ্ধ হয় এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যায়। এই সম্মেলনের মাধ্যমে দলকে গতিশীল করার জন্য নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন। আমরা আশা করি কাউন্সিলররা যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করবেন।”
যুবদল নেতা আব্দুল্লাহ আল মাসুদ সুমন বলেন, “৯ বছর আগেও আমরা জেলা বিএনপির মধ্যে বিভক্তি দেখেছি। সভাপতি একদিকে এবং সাধারণ সম্পাদক অন্যদিকে ছিলেন। কিশোরগঞ্জ শহর তখন অস্ত্রের ঝনঝনানি ও সন্ত্রাসের আখড়া ছিল। আমরা গত ৯ বছর ধরে ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বর্তমান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে ছিলাম। তাদের অনেক ত্যাগ রয়েছে। নতুন যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের অনেককেই আমরা রাজপথে দেখিনি। তাই আমরা পুরনো নেতৃত্বের ওপরই আস্থা রাখতে চাই।”
সম্মেলনের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির সভাপতি শরীফুল আলম বলেন, “১৩টি উপজেলা এবং ৮টি পৌরসভার জন্য মোট ২১টি ভোটকেন্দ্র থাকবে। স্বচ্ছ ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করা হবে। দীর্ঘদিন পর এই সম্মেলন একটি উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমি আশা করছি পুরো শহর জনসমুদ্রে পরিণত হবে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মঞ্চ ও প্যান্ডেল তৈরিতে কিছুটা সমস্যা হয়েছিল, তবে যথাসময়ে সকল কাজ সম্পন্ন হবে।”
তিনি আরও বলেন, “বিএনপি ভোটের অধিকারের জন্য আন্দোলন করেছে এবং রক্ত দিয়েছে। দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করার জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে তৃণমূলের কর্মীদের ভোটের মধ্য দিয়ে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।”
খবরওয়ালা/টিএসএন