খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬
ফুটবল ঐতিহাসিকভাবেই গোলদাতাদের খেলা। সবুজ গালিচায় স্ট্রাইকাররা যখন বল জালে জড়ান, গ্যালারিতে উন্মাদনা ছড়ায় আর পরদিন সংবাদপত্রের পাতায় তাঁদের নামই বড় করে ছাপা হয়। রক্ষণভাগ বা মাঝমাঠের কঠোর পরিশ্রম অনেক সময়ই গোলের জৌলুসের নিচে চাপা পড়ে যায়। তবে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগের রাতটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এই রাতটি স্ট্রাইকারদের নয়, বরং গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা দুই অতন্দ্র প্রহরীর বীরত্বগাথার সাক্ষী হয়ে রইল।
লিসবন ও মাদ্রিদ—দুই শহরেই আক্রমণভাগের তারকাদের ছাপিয়ে পাদপ্রদীপের আলোয় চলে এলেন দুই গোলরক্ষক। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে বায়ার্ন মিউনিখের গোলকিপার ম্যানুয়েল নয়্যার এবং লিসবনে স্পোর্তিংয়ের বিপক্ষে আর্সেনালের ডেভিড রায়া বুঝিয়ে দিলেন, আক্রমণভাগ ম্যাচ জেতালেও রক্ষণভাগ টুর্নামেন্ট জেতায়।
বয়সটা কেবলই একটি সংখ্যা—ম্যানুয়েল নয়্যার যেন এই প্রবাদের জীবন্ত বিজ্ঞাপন। ৪০ বছর বয়সেও রিয়াল মাদ্রিদের মতো বিধ্বংসী আক্রমণের সামনে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন হিমালয়ের মতো অটল হয়ে। ঘরের মাঠে রিয়াল মাদ্রিদ যখন একের পর এক আক্রমণ শানাচ্ছিল, তখন নয়্যার ৯টি চোখধাঁধানো সেভ করে বায়ার্নকে ২-১ গোলের গুরুত্বপূর্ণ জয় উপহার দেন। বিশেষ করে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো সময়ের সেরা ফরোয়ার্ডদের তিনটি করে নিশ্চিত গোলের শট রুখে দিয়ে তিনি ফুটবল বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেন।
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে গত পাঁচ মৌসুমের মধ্যে এটিই নয়্যারের এক ম্যাচে সর্বোচ্চ সেভ। মজার ব্যাপার হলো, চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্বে নয়্যারের ব্যক্তিগত সেরা রেকর্ডটি ছিল ২০১৭ সালে রিয়ালের বিপক্ষেই (১০টি সেভ)। ম্যাচের পর রিয়াল ডিফেন্ডার আন্তোনিও রুডিগার অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘আজকের ম্যাচে বায়ার্নের সেরা খেলোয়াড় নয়্যার।’ বায়ার্ন কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানিও তাঁর শিষ্যের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন, যদিও চোটাক্রান্ত থিবো কোর্তোয়ার সঙ্গে তুলনা এড়াতে তিনি কিছুটা কৌশলী উত্তর দেন।
অন্যদিকে লিসবনে স্পোর্তিংয়ের বিপক্ষে ১-০ গোলের ঘামঝরানো জয় পায় আর্সেনাল। এই জয়ে একমাত্র গোলটি কাই হাভার্টজ করলেও ম্যাচের আসল নায়ক ছিলেন ডেভিড রায়া। ৩০ বছর বয়সী এই স্প্যানিশ গোলরক্ষক বর্তমানে তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা সময় পার করছেন। ম্যাচে অন্তত চারটি এমন সেভ করেছেন যা নিশ্চিত গোল হতে পারত।
চলতি মৌসুমে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের গোলরক্ষকদের মধ্যে রায়ার পরিসংখ্যান রীতিমতো বিস্ময়কর। আর্সেনালের হয়ে ৪১ ম্যাচে অংশ নিয়ে তিনি ২২টিতেই ‘ক্লিন শিট’ বা কোনো গোল হজম না করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। সতীর্থ কাই হাভার্টজ তো আবেগে আপ্লুত হয়ে তাঁকে ‘বিশ্বের সেরা গোলরক্ষক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মিকেল আরতেতার আস্থার পূর্ণ প্রতিদান দিয়ে রায়া এখন গানারদের অঘোষিত ‘নাম্বার ওয়ান’।
গতকালের ম্যাচে ও চলতি মৌসুমে এই দুই গোলরক্ষকের প্রভাব নিচের টেবিল থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়:
| বৈশিষ্ট্য | ম্যানুয়েল নয়্যার (বায়ার্ন মিউনিখ) | ডেভিড রায়া (আর্সেনাল) |
| ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সেভ | ০৯ টি (বনাম রিয়াল মাদ্রিদ) | ০৪ টি (বনাম স্পোর্তিং) |
| মৌসুমের ক্লিন শিট সংখ্যা | – | ২২ টি (ইউরোপে সর্বোচ্চ) |
| চ্যাম্পিয়নস লিগ ক্লিন শিট | – | ০৭ টি |
| সেভ পার্সেন্টেজ (UCL) | – | ৯০% (৩০টির মধ্যে ২৭টি) |
| বিশেষ অর্জন | ৫ মৌসুমে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ সেভ | ইউরোপের শীর্ষ ৫ লিগে সর্বাধিক ক্লিন শিট |
ম্যাচ শেষে রায়া আমাজন প্রাইমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘গোল হজম না করলে ম্যাচ জেতা অনেক সহজ হয়ে যায়। আমরা এই ক্লিন শিট ধরে রাখার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি।’ অন্যদিকে নয়্যার জানিয়েছেন, রিয়ালের মতো দলের বিপক্ষে সেরাটা না দিলে টিকে থাকা অসম্ভব।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক ফুটবলে গোলরক্ষকের ভূমিকা কেবল বল ঠেকানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নয়্যার যেমন ‘সুইপার-কিপার’ হিসেবে খেলা তৈরিতে সাহায্য করেন, রায়া তেমনি নিখুঁত ডিস্ট্রিবিউশন ও ক্লিন শিটের রেকর্ড দিয়ে আর্সেনালের রক্ষণে প্রশান্তি ফিরিয়ে এনেছেন। গোলদাতারা যদি হয় দলের তলোয়ার, তবে নয়্যার ও রায়ার মতো গোলরক্ষকরা হলেন সেই বর্ম, যা ছাড়া কোনো যুদ্ধই জেতা সম্ভব নয়। গতকালের রাতটি ছিল সেই বর্মেরই জৌলুস দেখানোর রাত।