খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১ অক্টোবর ২০২৫
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে একটি বন্ধ মাদ্রাসার নামে ভুয়া রসিদ তৈরি করে দেশজুড়ে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। এই প্রতারণায় ব্যবহার করা হচ্ছে কোমলমতি শিশু-কিশোর এবং অসহায় বয়স্কদের। চাঞ্চল্যকর এই অভিযোগটি উপজেলার পশ্চিম পোঁয়া গ্রামের কাটাখালী দারুল উলুম ক্বেরাতুল কোরআন মাদ্রাসা ও পীর মতিনিয়া এতিমখানা নামের প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, রসিদে মুদ্রিত নামে পরিচিত মাদ্রাসাটিতে কোনো শিক্ষণ কার্যক্রম, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বা অন্যান্য কার্যকলাপ নেই। সেখানে আছে একটি পরিত্যক্ত প্রাঙ্গণ, শৌচাগার এবং একটি অব্যবহৃত একতলা ভবন। সড়কের পাশে সামনের দিকে ঝুলছে একটি সাইনবোর্ড, এই নাম ব্যবহার করেই চক্রটি রসিদ ছেপে, শিশু-কিশোর ও বয়স্কদের ভাড়া করে দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঁদা তোলার নামে জালিয়াতি চালাচ্ছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, চক্রটি নির্বাচিত শিশু-কিশোর ও বয়স্কদের হাতে টুপি, পাঞ্জাবি এবং টাকা আদায়ের রসিদ বই তুলে দেয়। এতিমদের আহার ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান ব্যয়ের অজুহাতে ধর্মীয় কথা বলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এই চাঁদা সংগ্রহ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মাওলানা তাজাম্মুল হোসাইনের ছেলে কে এম নুরে আলম সিদ্দিকী ও হাফেজ কে এম মোবারক হোসাইনের বিরুদ্ধে এই চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। এমন অভিযোগ তুলে ভুক্তভোগী এক কিশোরের মাতা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
স্থানীয়রা জানান, ওই গ্রামের প্রয়াত মাওলানা তাজাম্মুল হোসাইন তাঁর বাবার নামে ১৯৯১ সালে মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মাদ্রাসাটি সমাজসেবা অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রেশন নম্বর পেয়েছিল।
প্রতি বছর প্রতিষ্ঠানটিতে সরকারিভাবে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হতো। শুরুর দিকে মাদ্রাসায় কিছু সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী থাকলেও, অনিয়ম ও দুর্নীতি শুরু হওয়ায় সবাই চলে যায়। তখন থেকেই মাদ্রাসার শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম থেমে যায়। পাশাপাশি অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে কয়েক বছর আগে সরকারের তহবিল থেকে মাদ্রাসাটিতে অনুদান দেওয়াও বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকারের সহায়তা বন্ধ হলেও, ধর্মভীরু সাধারণ মানুষের সরলতাকে কাজে লাগিয়ে ওই মাদ্রাসার নামে রসিদ ছাপিয়ে সারা দেশে দান-অনুদান সংগ্রহের মাধ্যমে অর্থ আদায় অব্যাহত রয়েছে। মো. রায়হান নামে এক কিশোর রসিদ ব্যবহার করে কমিশনের বিনিময়ে টাকা সংগ্রহের কথা স্বীকার করেছে।
মো. মিজান, নুরুল ইসলাম খোকনসহ আরও অনেকে বলেন, কোনো কার্যক্রম চালু না থাকলেও সারা দেশে রসিদ ব্যবহার করে মাদ্রাসার নামে টাকা সংগ্রহ বন্ধ হয়নি। সঠিক তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই প্রতারক ও ভণ্ডদের কারণে ইসলামের বদনাম হবে।
থানায় অভিযোগকারী শাহীদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেসহ অন্যদের পাঞ্জাবি, টুপি পরিয়ে রসিদ বই দিয়ে টাকা তোলার জন্য মাদ্রাসার হুজুররা পাঠায়। এখান থেকে যারা টাকা তোলে তাদের একটি অংশ দেওয়া হয়, বাকি অর্থ নুরে আলম ও মোবারকের পরিবার নিয়ে যায়।’
অভিযোগ অস্বীকার করে কে এম নুরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘টাকা তোলার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তবে আমরা এখন আর এই মাদ্রাসা পরিচালনা করি না।’
অন্যদিকে হাফেজ কে এম মোবারক হোসাইন বলেন, ‘মাদ্রাসার কার্যক্রম এখন বন্ধ, তবে প্রতি বছর মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।’ কার্যক্রম বন্ধ থাকলে মাদ্রাসার নামে অর্থ সংগ্রহ এবং বাৎসরিক মাহফিল করা বৈধ কি না—এই প্রশ্নের উত্তর তিনি এড়িয়ে যান।
ফরিদগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ শাহআলম বলেন, ‘ওই মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট একটি অভিযোগ আমরা পেয়েছি। তদন্ত চলছে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘মাদ্রাসাটি সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকারি অনুদান, সাধারণত ক্যাপ Oিটেশন গ্র্যান্টের আওতাধীন ছিল। আমরা কয়েকবার পরিদর্শন করে দেখি মাদ্রাসাটিতে কোনো শিক্ষার্থী নেই। পরবর্তীতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বার্ষিক অর্থ প্রদান স্থগিত করা হয়। এখন যদি তারা আমাদের রেজিস্ট্রেশন ব্যবহার করে, তবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা রাজিয়া বলেন, ‘বিষয়টি দুঃখজনক। আমি খোঁজখবর নিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
খবরওয়ালা/টিএসএন