খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
উপমহাদেশের সঙ্গীত জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, এক নিবেদিত প্রাণ গবেষক ও সাধক ছিলেন ওস্তাদ সুধীন দাশ। তিনি শুধু একজন সঙ্গীতজ্ঞ নন—তিনি নিজেই ছিলেন এক চলমান প্রতিষ্ঠান, যার জীবন ও সাধনা মিশে আছে বাংলা গানের প্রতিটি সুরে, প্রতিটি আবেগে।
১৯৩০ সালের ৩০ এপ্রিল, কুমিল্লা-এর সাংস্কৃতিক আবহে তাঁর জন্ম। পিতা নিশিকান্ত দাশ ও মাতা হেমপ্রভা দেবীর স্নেহে বেড়ে ওঠা এই প্রতিভাবান শিল্পীর সঙ্গীতের হাতেখড়ি হয় বড় ভাই সুরেন দাশ-এর কাছে। তাঁরই অনুপ্রেরণায় সুধীন দাশ প্রবেশ করেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের গভীর সাধনায়।
সঙ্গীতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল সীমাহীন। গান গাওয়া, সুর করা, সঙ্গীত পরিচালনা কিংবা গবেষণা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রেখেছেন অসামান্য দক্ষতার স্বাক্ষর। বিশেষত বাংলা গানের ধ্রুবতারা কাজী নজরুল ইসলাম-এর সৃষ্টিকে শুদ্ধ ও প্রামাণ্য রূপে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অতুলনীয়। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টাতেই নজরুলসঙ্গীত এদেশে সুসংগঠিত ও প্রসারিত রূপ লাভ করে।
নজরুলগীতির স্বরলিপি সংরক্ষণে তিনি ছিলেন পথিকৃৎ। নজরুল ইনস্টিটিউট ও নজরুল একাডেমি থেকে প্রকাশিত তাঁর সম্পাদিত ২১ খণ্ডের স্বরলিপি গ্রন্থ বাংলা সঙ্গীত জগতে এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। একইভাবে লালনগীতির ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ইতিহাসে স্মরণীয়—তিনিই প্রথম লালনের গানের স্বরলিপি গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেন, যা এই ধারার সংগীতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সহায়তা করে।
১৯৪৭ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে অধ্যয়নকালেই তাঁর প্রতিভার প্রথম স্বীকৃতি আসে রেডিও অডিশনের মাধ্যমে। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সাল থেকে টেলিভিশনের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে তিনি সঙ্গীতচর্চাকে নিয়ে যান নতুন উচ্চতায়।
শিক্ষা ও সংগঠন—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান ছিল বিস্তৃত। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কালচারাল একাডেমির (ধানমন্ডি) প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ ছিলেন। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অনার্স ও মাস্টার্স পরীক্ষার পরীক্ষক, বেতার ও টেলিভিশনের গ্রেডেশন বোর্ডের প্রধান বিচারক এবং বাংলা স্বরলিপি প্রমাণীকরণ পরিষদের সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর হাত ধরে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনের গর্ব।
জীবদ্দশায় তিনি একুশে পদক (১৯৮৮)সহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হন। চ্যানেল আই আজীবন সম্মাননাও তাঁর কীর্তির স্বীকৃতি বহন করে।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সাদামাটা, কিন্তু সৃষ্টিশীলতায় অসাধারণ। তাঁর সুযোগ্য সন্তান নিলয় দাশ-ও সঙ্গীত জগতে সুপরিচিত।
২০১৭ সালের ২৭ জুন এই কিংবদন্তি সাধকের জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সুর, সাধনা আর জ্ঞানের দীপশিখা আজও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আলো ছড়াচ্ছে।
ওস্তাদ সুধীন দাশ আমাদের শিখিয়েছেন—সঙ্গীত শুধু বিনোদন নয়, এটি এক সাধনা, এক আত্মার ভাষা।
তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।