খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে পুঁজিবাজারের অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উত্থাপন করেছেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। বৃহস্পতিবার সকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদীয় কার্যক্রম শুরু হলে তিনি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও শেয়ারবাজারের দুরবস্থা নিয়ে নিজের বক্তব্য পেশ করেন। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বিগত দেড় দশকে পুঁজিবাজারে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন কেলেঙ্কারির সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
রুমিন ফারহানা তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার থেকে পরিকল্পিতভাবে একটি বিশেষ গোষ্ঠী ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। তিনি এই অর্থকে সাধারণ মানুষের “রক্তঘামানো সঞ্চয়” হিসেবে অভিহিত করেন। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ভবিষ্যতের আশায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন, যা একটি বিশেষ চক্র কৌশলে লুট করে নিয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বাজার থেকে উধাও হয়ে যাওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময়ে শেয়ারবাজারের অস্বাভাবিক দরপতন এবং কারসাজির ঘটনা ঘটলেও দায়ী ব্যক্তিদের কখনো যথাযথ বিচারের আওতায় আনা হয়নি। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই বারবার সিন্ডিকেট করে সাধারণ মানুষের টাকা লুট করার সাহস পেয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে বেশ কয়েকটি বড় ধরনের ধস ও কারসাজির ঘটনা ঘটেছে, যা রুমিন ফারহানার দাবির প্রেক্ষাপটকে আরও জোরালো করে। নিচে সংক্ষেপে তার একটি চিত্র তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিবরণ ও প্রভাব |
| লুটপাটের পরিমাণ | গত ১৫ বছরে আনুমানিক ১ লাখ কোটি টাকার বেশি। |
| বিনিয়োগকারীদের অবস্থা | লাখ লাখ সাধারণ বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত। |
| প্রধান অভিযোগ | বিশেষ সিন্ডিকেট ও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে শেয়ার দর বৃদ্ধি। |
| তদন্ত কমিটির রিপোর্ট | অতীতে ইব্রাহিম খালেদ কমিটিসহ একাধিক রিপোর্ট জমা হলেও সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। |
| দাবি | বিএসইসি-তে যোগ্য নিয়োগ এবং লুটকারীদের বিচার নিশ্চিত করা। |
সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা তার বক্তব্যে কেবল বিচারই দাবি করেননি, বরং পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপরও জোর দিয়েছেন। তিনি অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, পুঁজিবাজারের প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) যোগ্য, দক্ষ ও সৎ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে দক্ষ জনবল কাজ করলেই কেবল বাজারে স্বচ্ছতা আসবে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসবে।
তিনি বলেন, “পুঁজিবাজার একটি দেশের অর্থনীতির দর্পণ। যদি এই দর্পণ স্বচ্ছ না থাকে, তবে দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।” তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেয়ারবাজার লুটকারীদের চিহ্নিত করে তাদের অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার এবং বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।
সংসদে উত্থাপিত এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। বিগত সময়গুলোতে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোর সুপারিশ কেন বাস্তবায়ন করা হয়নি, সে বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে শেয়ারবাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অভিযুক্তদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। অর্থমন্ত্রীর প্রতি তিনি অনুরোধ জানান যেন দ্রুত একটি শক্তিশালী তদন্ত সেল গঠন করে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ লোপাটের রহস্য উন্মোচন করা হয় এবং দায়ী ব্যক্তিদের আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়।