খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২২ জুলাই ২০২৫
বন্ধুদের সঙ্গে হাসিমুখে ক্লাস শেষ করে বের হচ্ছিলেন ফারহান হাসান। হঠাৎ এক বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে চারদিক। চোখের সামনে তিনি দেখতে পান, একটি বিমান সরাসরি তাদের স্কুল প্রাঙ্গণে আছড়ে পড়ে। মুহূর্তেই আগুন ও ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চারপাশ। ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে।
ফারহান বলেন, “আমার চোখের সামনে জ্বলন্ত বিমানটি পড়ল। সবচেয়ে কাছের বন্ধু, যার সঙ্গে পরীক্ষা দিয়েছি, সে আমার সামনেই মারা গেল। বিমানটা ঠিক তার মাথার ওপর দিয়ে গেল। অনেক অভিভাবক তখন ভেতরে ছিলেন, কারণ স্কুল ছুটির পর ছোট বাচ্চারা বের হচ্ছিল… অনেক অভিভাবকও প্রাণ হারিয়েছেন।”
সোমবার দুপুর ১টার কিছুক্ষণ পর এফ-৭ বিজিআই মডেলের একটি প্রশিক্ষণ বিমান যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে স্কুল ভবনে বিধ্বস্ত হয়। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় পাইলট জনবহুল এলাকা এড়িয়ে অন্যদিকে নিতে চাইলেও সফল হতে পারেননি। বিমানটির চালক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও নিহত হয়েছেন।
ভয়াবহ এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৭ জন নিহত ও ১৭০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। বার্ন ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দগ্ধ ৫০ জনের অধিক রোগী হাসপাতালে ভর্তি, যাদের বেশিরভাগের বয়স ৯ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে।
স্কুলের শিক্ষক রেজাউল ইসলাম বলেন, “আমি নিজের চোখে বিমানটিকে ভবনের ওপর আছড়ে পড়তে দেখেছি।” অন্য এক শিক্ষক মাসুদ তারেক রয়টার্সকে জানান, “হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দ শুনি। পেছনে তাকিয়ে দেখি আগুন আর ঘন ধোঁয়া। আশপাশে অনেক অভিভাবক ও শিশু ছিল।”
দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। উৎসুক জনতা আশপাশের ভবনের ছাদে উঠে ঘটনার দৃশ্য দেখার চেষ্টা করে। অ্যাম্বুলেন্স ও স্বেচ্ছাসেবকেরা দ্রুত আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। অন্তত ৩০টি অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনাস্থলে কাজ করে।
এক নারী জানান, তাঁর ছেলে দুর্ঘটনার পরপরই ফোন করেছিল, তারপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
হাসপাতালে নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। অষ্টম শ্রেণির ছাত্র তানভীর আহমেদের চাচা শাহ আলম বলেন, “আমার আদরের ভাতিজা এখন মর্গে।”
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আহতদের ঢাকার সাতটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অনেক সাধারণ মানুষ রক্তদানের জন্য হাসপাতালে ছুটে যান।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার আজ মঙ্গলবার (২২ জুলাই) একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে।
বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্ঘটনার তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস এক্সে দেওয়া বার্তায় লেখেন, “এটি জাতির জন্য গভীর শোকের সময়। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে।”
এ ভয়াবহ দুর্ঘটনা শুধু হতাহতের তালিকাই দীর্ঘ করেনি, বরং পুরো জাতিকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে।
খবরওয়ালা/টিএস