খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আজ ১৬ ফেব্রুয়ারি—বাঙালির জাতীয় মুক্তি ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক অগ্রসৈনিক, জাসদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সমাজ রূপান্তরের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সাহসী নেতা জাতীয় বীর কাজী আরেফ আহমেদের হত্যা দিবস। শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি তাঁর মৌলিক অবদান, দূরদর্শী রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং আপসহীন সংগ্রামী জীবনকে।
ষাটের দশক: আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের রূপরেখা
ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসনের বৈষম্য, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও রাজনৈতিক দমননীতির বিরুদ্ধে যে আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকশিত হয়, তার তাত্ত্বিক বিনির্মাণে কাজী আরেফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তিনি কেবল স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেননি—স্বাধীনতার চরিত্র কেমন হবে, তার সামাজিক ভিত্তি কী হবে, রাষ্ট্রক্ষমতা কাদের হাতে যাবে—এসব প্রশ্নও উত্থাপন করেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে স্বাধীনতা মানে ছিল শুধু ভূখণ্ডগত মুক্তি নয়, বরং শোষণমুক্ত, সমাজতান্ত্রিক অভিমুখী রাষ্ট্র নির্মাণ।
মুক্তিযুদ্ধ ও বিপ্লবী রাজনৈতিক দিকনির্দেশ
১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি, গণযুদ্ধের কৌশল এবং মুক্তিযুদ্ধের ওপর সমাজতান্ত্রিক আদর্শিক প্রভাব বিস্তারে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতার পর তিনি বিপ্লবী জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন—যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার আহ্বান।
এই ধারাবাহিকতায় তিনি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং বিপ্লবী গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগঠিত করেন।
১৯৭৫-পরবর্তী বাস্তবতা ও নতুন রাজনৈতিক তত্ত্ব
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড এবং ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতির চরিত্র আমূল বদলে যায়। মুক্তিযুদ্ধপন্থী শক্তিকে কোণঠাসা করে পাকিস্তানপন্থী ও প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির পুনরুত্থান শুরু হয়।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতার বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করে কাজী আরেফ আহমেদ জাতীয় রাজনীতির “প্রধান দ্বন্দ্ব” নতুনভাবে চিহ্নিত করেন। তাঁর মতে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তির দ্বন্দ্বই হয়ে ওঠে প্রধান রাজনৈতিক প্রশ্ন।
এই তাত্ত্বিক নির্ধারণ ছিল সময়োপযোগী ও কৌশলগত—যার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধপন্থী শক্তির বৃহত্তর ঐক্য।
তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ সালে আওয়ামী লীগ ও সিপিবিসহ বিভিন্ন শক্তিকে নিয়ে ১০-দলীয় জোট এবং ১৯৮৩ সালে ১৫-দলীয় জোট গঠনে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের রণকৌশল নির্ধারণেও তিনি ছিলেন অগ্রসেনানী।
গণআদালত ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন
১৯৯২ সালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন এবং একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিচারের দাবিতে জাতীয় সমন্বয় কমিটি ও ঐতিহাসিক গণআদালত গঠনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। এই গণআদালত ছিল রাষ্ট্রীয় নীরবতার বিরুদ্ধে জনমতের উচ্চারণ—একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান, যা পরবর্তীকালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ প্রশস্ত করে।
সাম্প্রদায়িকতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে অবস্থান
কাজী আরেফ আজীবন সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, সামন্তবাদী চিন্তা ও ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রগতিশীল রাজনীতির ধারক ছিলেন। তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল কেবল ক্ষমতার প্রশ্ন নয়—চেতনার প্রশ্ন, মূল্যবোধের প্রশ্ন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্ন।
তিন যুগের সংগ্রামী নেতা
১৯৬২ সালের ছাত্রআন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্গঠন, সামরিক শাসনবিরোধী গণআন্দোলন এবং নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক উত্তাল সময়ে—প্রতিটি পর্যায়ে তিনি রণনীতি ও রণকৌশলের তত্ত্ব নির্মাণের পাশাপাশি মাঠের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তাঁর রাজনীতি ছিল তাত্ত্বিক দৃঢ়তা ও কর্মমুখী সাহসের অনন্য সমন্বয়।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
জাতীয় বীর কাজী আরেফ আহমেদ আমাদের শিখিয়েছেন—
স্বাধীনতা একদিনে অর্জিত হয়, কিন্তু তার চেতনা রক্ষা ও বিকাশের সংগ্রাম চলমান।
রাষ্ট্র গড়া যায়, কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে লাগে নিরন্তর লড়াই।
আজ তাঁর হত্যা দিবসে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি এই মহান সংগ্রামীকে।
তাঁর স্বপ্ন—একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ—আমাদের পথচলার প্রেরণা হয়ে থাকুক।