খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রীকে রাস্তা থেকে টেনেহিঁচড়ে অন্ধকারে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনার ৪০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার না করার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেছেন সাধারণ একদল শিক্ষার্থী। সোমবার (২২ জুন) বিকেল চারটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলাভবন সংলগ্ন মুরাদ চত্বর থেকে ‘নারী নিরাপত্তা মঞ্চ’-এর ব্যানারে এই বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করা হয়। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে নতুন প্রশাসনিক ভবনের সামনে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়।
গত ১২ মে রাত আনুমানিক ১১টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ফজিলাতুন্নেছা হল সংলগ্ন অন্ধকার রাস্তা থেকে এক ছাত্রীকে অজ্ঞাত এক যুবক জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে ঝোপঝাড়ের দিকে নিয়ে যায়। সেখানে ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টা করা হয়। ঘটনার পর পরই সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে অভিযুক্ত বহিরাগত যুবককে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। ঘটনার দিন রাতেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সিসিটিভি ফুটেজের প্রমাণের ভিত্তিতে সাভারের আশুলিয়া থানায় একটি লিখিত মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তবে ঘটনার দীর্ঘ ৪০ দিন পার হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়নি।
বিক্ষোভ সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের উদাসীনতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সমাবেশে বক্তব্য প্রদানকালে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী লামিশা জামান বলেন, এই ঘটনার পর পরই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী একত্রিত হয়ে অপরাধীর শাস্তির দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিলেন। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিকট দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ছয়টি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও প্রশাসন একটি দাবিরও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন বা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি।
শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেন, প্রথম দাবিটিই ছিল ধর্ষককে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা। এর মধ্যে ৪০টি দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে এবং একটি বড় উৎসব ঈদও পার হয়ে গেছে, অথচ এখনো অপরাধীকে গ্রেপ্তার করার মতো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা দৃশ্যমান হয়নি। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে ক্যাম্পাসে অবস্থানরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মানসিক আবহাওয়া চরম বিঘ্নিত হচ্ছে বলে তারা দাবি করেন।
সমাবেশে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সংগঠক সোহাগী সামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, যখন ক্যাম্পাসে ধর্ষণচেষ্টার এই নির্দিষ্ট ঘটনাটি নিয়ে তীব্র আন্দোলন চলমান ছিল, ঠিক তখনই একটার পর একটা নতুন নিপীড়নের ঘটনা ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে ঘটেছে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে লক্ষ্য করে বলেন, দোষী ব্যক্তিকে মাঠ থেকে গ্রেপ্তার করার সরাসরি আইনি দায়িত্ব হয়তো প্রশাসনের নয়, তবে এই ক্যাম্পাসের পুরো সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার মূল আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।
তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, বিগত দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে এই প্রগতিশীল শিক্ষাঙ্গনে অনেকগুলো নারী নিপীড়নের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এর একটি ঘটনারও সুষ্ঠু ও স্থায়ী সুরাহা করতে পারেনি। বর্তমানে ক্যাম্পাসে যে ভঙ্গুর নিরাপত্তাব্যবস্থা বিরাজ করছে, তা এক দিনে তৈরি হয়নি। এটি মূলত প্রশাসনের দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক অবহেলা, নিষ্ক্রিয়তা এবং উদাসীনতার ফলেই এক চরম বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।
বিক্ষোভ সমাবেশে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা যেকোনো মূল্যে তাদের আন্দোলন জারি রাখার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ছাত্র প্রতিনিধিরা প্রশাসনকে সতর্ক করে বলেন, আন্দোলনের আকার ছোট কিংবা বড় যাই হোক না কেন, যতোদিন পর্যন্ত তাদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো পুরোপুরি আদায় না হচ্ছে, ততোদিন পর্যন্ত তারা এই আন্দোলন রাজপথে চালিয়ে যাবেন। শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরে গেছে ভেবে প্রশাসনের পার পাওয়ার বা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার কোনো সুযোগ নেই।
সমাবেশে বক্তারা স্পষ্ট করে বলেন, পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং র্যাবসহ দেশের সকল শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রীয় বাহিনী অপরাধীকে ধরার চেষ্টা করছে বলে জানানো হলেও ৪০ দিন শেষে ফলাফলের খাতা সম্পূর্ণ শূন্য। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেমন তার চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোও চূড়ান্ত রকম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তারা অবিলম্বে এই অচলাবস্থা নিরসন করে অপরাধীর গ্রেপ্তারের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সচেতন ও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।