খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা ক্রেডিটসাইটসের (CreditSights) সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাইওয়ানের জীবন বীমা বাজার দীর্ঘমেয়াদি মন্দা কাটিয়ে বর্তমানে ধীরগতির পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মূলত ২০১৮ সালে এই খাতটি ব্যবসায়িক দিক থেকে তার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল। তবে সেই শীর্ষাবস্থান থেকে পরবর্তী বছরগুলোতে জীবন বীমা খাতের মোট প্রিমিয়াম আয় প্রায় ৩৮ শতাংশ হ্রাস পায়। এই বড় ধরনের পতনের পর বাজারটি এখন অত্যন্ত ধীরগতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে তাইওয়ানের জীবন বীমা খাতে ব্যাপক সংকোচন দেখা যায়। এই নেতিবাচক পরিস্থিতির পেছনে প্রধানত দুটি কারণকে দায়ী করা হয়েছে: প্রথমত, দেশটির নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর আইনি বিধিনিষেধ এবং দ্বিতীয়ত, করোনা মহামারীকালীন বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের তীব্র অস্থিরতা।
ঐতিহাসিকভাবে তাইওয়ানের স্থানীয় পরিবারগুলো তাদের সঞ্চিত অর্থ ব্যাংকে আমানত হিসেবে রাখার বিকল্প মাধ্যম হিসেবে ‘সঞ্চয়-ধর্মী বীমা নীতি’ (Savings-type policies) ব্যবহার করে আসছিল। কিন্তু পরিবর্তিত ও কঠোর নিয়মনীতির কারণে এই সঞ্চয়-ধর্মী পলিসিগুলোর আকর্ষণ ও গ্রহণযোগ্যতা সাধারণ গ্রাহকদের কাছে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। যেহেতু এই আইনি ও নিয়ন্ত্রণমূলক পরিবর্তনগুলো সাময়িক নয়, বরং সম্পূর্ণ কাঠামোগত, তাই ২০২৪ সাল থেকে বাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা বা উন্নতির লক্ষণ দেখা গেলেও সামগ্রিক পুনরুদ্ধারের গতি এখনো বেশ ধীর।
তীব্র ব্যবসায়িক মন্দা এবং ধীরগতির পুনরুদ্ধার সত্ত্বেও বৈশ্বিক বীমা বাজারে তাইওয়ান এখনো অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। দেশটির নাগরিকদের উচ্চ পারিবারিক সঞ্চয় প্রবণতা এবং ক্রমবর্ধমান বয়োবৃদ্ধ জনসংখ্যার (Ageing population) কারণে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি বীমাকৃত বাজারগুলোর একটি হিসেবে তাইওয়ান নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।
বর্তমানে তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ জীবন বীমা বাজারটি সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পূর্বে এই খাতে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাচীন বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত শিথিল অ্যাকাউন্টিং পদ্ধতি এবং মূলধন কাঠামোর কারণে বাড়তি সুবিধা পেত। এর ফলে বিদেশি বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য বিপুল মূলধন বিনিয়োগ করে স্থানীয় বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন ছিল এবং তারা বাজার থেকে একপ্রকার দূরেই অবস্থান করছিল।
তাইওয়ানের জীবন বীমা খাতের এই সনাতন দৃশ্যপটে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অ্যাকাউন্টিং মানদণ্ড ‘আইএফআরএস ১৭’ (IFRS 17) এবং স্থানীয়ভাবে প্রণীত নতুন মূলধন কাঠামো ‘তাইওয়ান ইন্স্যুরেন্স ক্যাপিটাল স্ট্যান্ডার্ড’ (TW-ICS) যৌথভাবে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। এই নতুন আর্থিক ও আইনি নীতিমালার প্রয়োগের ফলে দীর্ঘমেয়াদে বাজারের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে এর তুলনা করা সহজ হবে। আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, এই আধুনিকায়নের ফলে তাইওয়ানের বাজারে বিদেশি বীমা কোম্পানিগুলোর নতুন করে আগ্রহ তৈরি হতে পারে এবং তারা পুনরায় বিনিয়োগে উৎসাহিত হতে পারে।
২০২০ সালে সরকারের পক্ষ থেকে আইনি সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করার পর থেকেই এই শিল্পের পণ্যের মিশ্রণে (Product mix) দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। পূর্ববর্তী বছরগুলোতে তাইওয়ানের জীবন বীমা বাজারে প্রচলিত বা সাধারণ জীবন বীমা পলিসিগুলোর (Standard life policies) একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, যা মোট প্রিমিয়াম আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ দখল করে রাখত। তবে ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই প্রচলিত পলিসিগুলোর অবদান হ্রাস পেয়ে মোট প্রিমিয়াম আয়ের ৬৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে, সাধারণ জীবন বীমা পলিসির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কোম্পানিগুলো এখন উচ্চ-মুনাফা সম্পন্ন এবং সুদের হারের পরিবর্তনের প্রতি কম সংবেদনশীল এমন সুরক্ষামূলক পলিসির দিকে ঝুঁকছে। এর ফলে বাজারে স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনাজনিত বীমা পণ্যের অংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আইএফআরএস ১৭ এবং টিডব্লিউ-আইসিএস (TW-ICS) নির্দেশিকার অধীনে উচ্চ-মার্জিনের এই সুরক্ষামূলক নীতি বা পলিসির দিকে রূপান্তরের এই ধারা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বীমা খাতের সামগ্রিক বিনিয়োগের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তাইওয়ানের জীবন বীমা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারের বাইরে বিনিয়োগ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই খাতের মোট বিনিয়োগের প্রায় ৬৮ শতাংশ সম্পদই বর্তমানে বিদেশি বা আন্তর্জাতিক সম্পদে (Overseas assets) নিয়োজিত রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক অ্যাকাউন্টিং ব্যবস্থার মেলবন্ধনে তাইওয়ানের জীবন বীমা খাতটি এখন এক নতুন যুগের মধ্য দিয়ে ধীর পায়ে অগ্রসর হচ্ছে।